ভবদহ অঞ্চলের মানুষের কাছে বোরো ধান শুধু একটি ফসল নয়, এটি টিকে থাকার আশার নাম। বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে এবারের বোরো মৌসুমে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ভবদহ এলাকার সুজাতপুরসহ ছয়টি গ্রামে মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধ ভেঙে দেড় হাজার বিঘার বেশি ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সদ্য তৈরি করা বোরো ধানের বীজতলা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পাঁচ শতাধিক কৃষক পরিবার এখন দিশেহারা।
ভবদহে জলাবদ্ধতার পুরোনো ক্ষত আবার জেগে উঠল
ভবদহ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই জলাবদ্ধতার অভিশাপে জর্জরিত। বর্ষা এলেই মাঠ-ঘাট পানিতে ডুবে যায়। অনেক বছর পর এবার শুষ্ক মৌসুমে পানি কিছুটা নামায় কৃষকেরা বোরো আবাদে মনোযোগ দেন। ধারদেনা করে বীজ, সার, সেচের ব্যবস্থা করেন। কেউ কেউ শেষ সম্বলটুকুও বাজি রাখেন। কিন্তু অতিরিক্ত পানির চাপ সামলাতে না পেরে যখন মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধ ভেঙে গেল, তখন সব হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়।
কীভাবে ভেঙে পড়ল বেড়িবাঁধ
বুধবার অতিরিক্ত পানির চাপে সুজাতপুর পল্লীমঙ্গল মৎস্য ঘেরের দক্ষিণ পাশের বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ নিশ্চিত করতে প্রায় এক মাস ধরে একটানা ৪০টির বেশি সেচযন্ত্র দিয়ে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছিল। দীর্ঘদিন ধরে পানি তুলতে থাকায় ঘেরের ভেতরে পানির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ আর ধরে রাখতে পারেনি বেড়িবাঁধ। মুহূর্তের মধ্যে পানি ঢুকে পড়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে।
ছয়টি গ্রাম প্লাবিত, আতঙ্কে তিন হাজার মানুষ
এই প্লাবনে মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর, হাটগাছা ও কুলটিয়া এবং অভয়নগর উপজেলার মশিয়াহাটী, বেদভিটা ও বলারাবাদ গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। প্রায় তিন হাজার মানুষ এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের বসতবাড়ির উঠান, রান্নাঘর, বাগান, সবজি ক্ষেত ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও আবার পুকুরের মাছ বেরিয়ে গেছে, কোথাও ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা।
বোরো ধানের বীজতলা ধ্বংস, কৃষকের মাথায় হাত
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা জানান, বোরো মৌসুমের শুরুতেই তারা প্রচুর খরচ করে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ—সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু আকস্মিক প্লাবনে সেই বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে বীজতলা তৈরি করা সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই প্রায় অসম্ভব। অনেকেই বলছেন, এবার আর বোরো আবাদ করা যাবে না। এতে সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মৎস্য ঘেরেও বড় ক্ষতি, মাছ ভেসে গেছে পানিতে
শুধু কৃষকরাই নন, বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৎস্যচাষিরাও। কুলটিয়া গ্রামের মৎস্য ঘের মালিক স্বপন রায় জানান, তার তিন শতাধিক বিঘা জমির ঘেরের বেড়িবাঁধ ভেঙে মাছ পানিতে ভেসে গেছে। বছরের শুরুতেই এমন ক্ষতি সামলানো তার পক্ষে কঠিন। একই গ্রামের তপন রায় বলেন, তার ঘেরের উত্তর পাশের বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রায় ৮শ’ বিঘা ঘেরের মাছ নষ্ট হয়ে গেছে। এই ক্ষতি কোনোভাবেই সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়।
জীবন-জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতি হুমকির মুখে
ভবদহ অঞ্চলের মানুষের বেশিরভাগই কৃষি ও মৎস্যনির্ভর। বোরো আবাদ ও মাছচাষ ব্যাহত হলে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে। কৃষক কাজ হারাবেন, শ্রমিকদের আয় কমবে, বাজারে ধানের সরবরাহ কমে যাবে। এর প্রভাব পড়বে খাদ্যের দাম ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতি আরও বাড়বে
পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি অভয়নগর শাখার আইন বিষয়ক সম্পাদক অনিল বিশ্বাস বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি ইতোমধ্যে মৎস্য বিভাগ, কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। তিনি জানান, দ্রুত ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার না করা হলে পানি আরও ছড়িয়ে পড়বে এবং ক্ষতির পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে রাজনৈতিক নেতারা
বৃহস্পতিবার যশোর-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ও মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি, নষ্ট বীজতলা ও ভেঙে পড়া বেড়িবাঁধ ঘুরে দেখেন। কৃষক ও মৎস্যচাষিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্দশার কথা শোনেন। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে দ্রুত সরকারি সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলে দাবি তোলার আশ্বাস দেন।
পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সন্তোস স্বর, কুলটিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. হামিদুল ইসলাম, প্রবীণ নেতা পরিতোষ বিশ্বাস, নিপুন বিশ্বাসসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি
ভবদহ অঞ্চলের মানুষ মনে করছেন, বারবার একই ধরনের বিপর্যয় প্রমাণ করে বর্তমান পানি ব্যবস্থাপনা টেকসই নয়। শুধু অস্থায়ী সেচ বা জরুরি বাঁধ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী বেড়িবাঁধ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
এলাকাবাসীর জোর দাবি
এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি, দ্রুত বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে শুধু এবছর নয়, ভবিষ্যতেও বোরো আবাদ ও মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ভবদহের এই বিপর্যয় শুধু একটি এলাকার গল্প নয়। এটি আমাদের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পনার দুর্বলতার বাস্তব চিত্র। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার নেবে।


