শীতের কামড় আবার টের পাচ্ছে কলকাতা। কয়েক দিন একটু স্বস্তি থাকলেও ফের নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে পারদ। চলতি শীতের মরসুমে একটা জিনিস স্পষ্ট। এ বার উত্তরবঙ্গ নয়, বরং দক্ষিণবঙ্গই শীতের দাপট দেখাচ্ছে। এমনকি পাহাড়ি শহর কালিম্পংকেও টেক্কা দিচ্ছে বীরভূম আর নদিয়ার মতো সমতলের জেলা। বিষয়টা শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বাস্তবে সেটাই হচ্ছে।
কলকাতায় ফের ঠান্ডা বেড়েছে
গত দু’দিন কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। কিন্তু শুক্রবার শহরের পারদ নেমে এসেছে ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় দুই ডিগ্রি কম। দিনের বেলাতেও গরমের নামগন্ধ নেই। বৃহস্পতিবার কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল মাত্র ২৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত, যা স্বাভাবিকের থেকে ১ ডিগ্রিরও বেশি কম।
সকাল আর রাতের দিকে ঠান্ডার অনুভূতি বেশ স্পষ্ট। হালকা শাল বা সোয়েটার ছাড়া বাইরে বেরোলে ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে। শহরের বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, জানুয়ারির মাঝামাঝি এমন ঠান্ডা বেশ উপভোগ্য।
শীতে উত্তরবঙ্গকে টেক্কা দিচ্ছে দক্ষিণবঙ্গ
সাধারণত শীত বললেই সবার আগে মনে পড়ে দার্জিলিং, কালিম্পং বা শিলিগুড়ির কথা। কিন্তু এ বার ছবিটা একটু আলাদা। চলতি শীতে একের পর এক দিন দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ি শহরের থেকেও কম পারদ রেকর্ড হচ্ছে।
শুক্রবার বীরভূমের শ্রীনিকেতন রাজ্যের শীতলতম শহরগুলির তালিকায় দার্জিলিঙের পরেই উঠে এসেছে। সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছিল ৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। পাহাড়ি কালিম্পংয়ে যেখানে পারদ ৮.৫ ডিগ্রির নিচে নামেনি, সেখানে সমতলের শ্রীনিকেতন আরও ঠান্ডা হয়ে উঠেছে।
দার্জিলিং এখনও রাজ্যের শীতলতম
সব কিছুর মাঝেও দার্জিলিং নিজের জায়গা ধরে রেখেছে। শুক্রবার দার্জিলিঙে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল মাত্র ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজ্যের মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম। সকালে পাহাড়ে কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশার দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে অবাক করার বিষয় হল, দার্জিলিং ছাড়া উত্তরবঙ্গের অনেক শহরই দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলার তুলনায় তুলনামূলক উষ্ণ ছিল।
দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে কত নেমেছে পারদ
শুক্রবার দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় তাপমাত্রার ছবিটা ছিল বেশ চমকপ্রদ। নদিয়ার কল্যাণীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছিল ৮.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ঝাড়গ্রামে পারদ ছিল ৮.৮ ডিগ্রি, বাঁকুড়ায় ৮.৬ ডিগ্রি এবং মেদিনীপুরে ৯.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আসানসোলে তাপমাত্রা নেমেছিল ৯.৮ ডিগ্রি, কলাইকুণ্ডায় ৯.৬ ডিগ্রি এবং উলুবেড়িয়াতেও ছিল ৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিঘায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০.১ ডিগ্রি। ক্যানিং, বহরমপুর, পুরুলিয়া ও ব্যারাকপুরে পারদ ঘোরাফেরা করেছে ১০ ডিগ্রির আশপাশে।
এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় শীতের দাপট কতটা শক্ত।
ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি
শুধু ঠান্ডা নয়, রাজ্য জুড়ে কুয়াশাও বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবহাওয়া দফতর উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, কোচবিহার, মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরে ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি করেছে। কোথাও কোথাও দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে ৫০ মিটার পর্যন্ত।
দক্ষিণবঙ্গেও পরিস্থিতি আলাদা নয়। হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, নদিয়া, বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদে সকালের দিকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। এর ফলে রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন সাধারণ মানুষ।
কেন এ বার দক্ষিণবঙ্গে এত ঠান্ডা
অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, এ বার কেন দক্ষিণবঙ্গে এত বেশি ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তুরে হাওয়ার প্রভাব এবং আকাশ পরিষ্কার থাকার কারণেই রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাচ্ছে। বাতাসে জলীয় বাষ্প কম থাকায় শীতের অনুভূতি আরও বেড়েছে।
গ্রামাঞ্চলে এর প্রভাব আরও বেশি। খোলা জায়গা আর গাছপালার জন্য রাতের ঠান্ডা সেখানে দ্রুত জমে যাচ্ছে।
আগামী দিনে তাপমাত্রা বাড়বে কি না
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আপাতত উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে তাপমাত্রার খুব বেশি হেরফের হবে না। আগামী তিন দিন পরিস্থিতি মোটামুটি একই রকম থাকবে। তবে তার পরের তিন দিনে ধীরে ধীরে দুই থেকে তিন ডিগ্রি পর্যন্ত পারদ বাড়তে পারে।
অর্থাৎ এখনই শীত বিদায় নিচ্ছে না। যারা ঠান্ডা ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য আরও কিছু দিন শীত উপভোগ করার সুযোগ থাকছে।
শীতের মরসুমে কীভাবে সতর্ক থাকবেন
এই সময় সকালে বেরোনোর আগে কুয়াশার কথা মাথায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে যাঁরা বাইক বা গাড়ি চালান, তাঁদের ধীরে চলাই ভালো। বয়স্ক মানুষ আর শিশুদের ক্ষেত্রে গরম জামাকাপড় ব্যবহার করা দরকার।
এক কাপ গরম চা বা কফি, সকালের রোদ আর সন্ধ্যায় হালকা শাল—এই ছোট ছোট অভ্যাসই শীতকে উপভোগ্য করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চলতি শীতে দক্ষিণবঙ্গ সত্যিই চমক দিচ্ছে। পাহাড়কে টেক্কা দিয়ে সমতলের জেলাগুলি যে এমন শীতল হয়ে উঠতে পারে, তা হয়তো অনেকেই ভাবেননি। এখন দেখার, আগামী দিনে এই শীত কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।


