ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে আসা নিয়ে বাংলাদেশের অনড় অবস্থান এখন শুধু ক্রিকেটের বিষয় নয়। এই প্রশ্নে জড়িয়ে গেছে রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি এবং ক্ষমতার লড়াই। এক বার নয়, দু’বার নয়—তিন-তিন বার ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। আইসিসি-র চাপ, ভারতের আশ্বাস, এমনকি প্রাক্তন অধিনায়ক তামিম ইকবালের পরামর্শও তাদের মন গলাতে পারেনি। প্রশ্ন উঠছেই—বাংলাদেশ এতটা জেদ দেখাচ্ছে কেন? আর এই জেদে আসলে ক্ষতি হচ্ছে কার?
বাংলাদেশ কি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে?
প্রথমেই যে প্রশ্নটা সবার মাথায় আসে, তা হল অর্থনৈতিক ক্ষতি। অনেকেই ভাবছেন, ভারতে না খেললে বাংলাদেশ বোর্ড বিপুল টাকার লোকসানে পড়বে। বাস্তবটা কিন্তু তা নয়। কারণ, এটি আইসিসি-র টুর্নামেন্ট। ফলে ম্যাচ কোথায় খেলল, তা বড় বিষয় নয়। অংশগ্রহণের অর্থ এবং পুরস্কারমূল্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পেতেই থাকবে। ভারত হোক বা শ্রীলঙ্কা—টাকা একই থাকবে।
বরং আর্থিক দিক থেকে বেশি চাপ পড়তে পারে ভারতের উপর। কারণ, ম্যাচ সরলে স্টেডিয়ামের টিকিট বিক্রি থেকে যে রাজস্ব আসত, তা কমে যাবে। স্থানীয় স্পনসরদের একাংশও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। সম্প্রচার সংস্থা এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের পরিকল্পনাও বদলাতে হবে। ফলে আর্থিক ধাক্কা বাংলাদেশের নয়, বরং ভারতেরই বেশি।
আইসিসির উপর কেন বাড়ছে চাপ
বাংলাদেশের ম্যাচ যদি ভারতে না হয়ে শ্রীলঙ্কায় সরে যায়, তা হলে আইসিসির খরচও বেড়ে যাবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, গ্রুপ পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ চারটি দেশকেও শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যেতে হবে। যাতায়াত, হোটেল, নিরাপত্তা, সম্প্রচার—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয়। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ফলে আইসিসি নিজেও অস্বস্তিতে পড়েছে।
বাংলাদেশের জেদের নেপথ্যে আসল কারণ কী
দেখতে বিষয়টা ক্রিকেট হলেও এর নেপথ্যে রাজনীতির ছায়া স্পষ্ট। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন আগের মতো মসৃণ নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্তর্বর্তী সরকার, এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি করেছে।
গত বছর অগস্টে বাংলাদেশের পরিস্থিতির কারণে ভারত তাদের সফর স্থগিত করেছিল। এ বছর আবার বাংলাদেশ যখন ভারতীয় দলের সফরের ঘোষণা করল, ঠিক তার পর দিনই বিসিসিআই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেয় আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কলকাতা সেই নির্দেশ মানে। এর পরই কার্যত পাল্টা চাল হিসেবে বাংলাদেশ জানিয়ে দেয়, তারা ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে আসবে না।
অনেকের মতে, মুস্তাফিজুর ইস্যুই এই জেদের মূল ট্রিগার। বাংলাদেশ মনে করছে, রাজনৈতিক স্বার্থে ক্রিকেটকে ব্যবহার করেছে ভারত। সেই ক্ষোভ থেকেই এই কঠোর অবস্থান।
ক্রিকেটের বাইরে ‘মাঠের লড়াই’
মাঠের লড়াইয়ে ভারত বরাবরই এগিয়ে। পরিসংখ্যান সে কথাই বলে। কিন্তু মাঠের বাইরে এই লড়াইয়ে বাংলাদেশ নিজেদের শক্ত অবস্থান দেখাতে চাইছে। তারা বোঝাতে চাইছে, ভারত যতই ক্ষমতাশালী হোক, সব সিদ্ধান্ত এক তরফা ভাবে চাপিয়ে দিতে পারবে না।
অনেকে এটাকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতীকী প্রতিবাদ বলেও দেখছেন। ক্রিকেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।
ভারতের জন্য কেন বিষয়টি বেশি অস্বস্তিকর
এই বিশ্বকাপে ভারতের সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কা। গ্রুপ পর্বের ৪০টি ম্যাচের মধ্যে ১৪টি শ্রীলঙ্কায় হওয়ার কথা। যদি বাংলাদেশের ম্যাচও সেখানে চলে যায়, শ্রীলঙ্কা আয়োজন করবে ১৮টি ম্যাচ, আর ভারত পাবে ২২টি। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক প্রতিযোগিতাই ভারতের বাইরে।
এর উপর সুপার এইটের ম্যাচের হিসেব ধরলে ভারতে ম্যাচের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে। গ্রুপ পর্বে ভারতের মাটিতে এমনিতেই খুব বেশি ‘হাই ভোল্টেজ’ ম্যাচ নেই। অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তানের মতো দলগুলো তাদের বেশির ভাগ ম্যাচ খেলবে শ্রীলঙ্কায়। ফলে দর্শক আগ্রহ, টিকিট বিক্রি এবং টুর্নামেন্টের জৌলুস—সব কিছুর উপর প্রভাব পড়বে।
ইডেন গার্ডেন্স কী হারাতে পারে
কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সের জন্যও বিষয়টি বড় ধাক্কা। আইসিসি কলকাতা-ঢাকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক মাথায় রেখে বাংলাদেশের তিনটি ম্যাচ ইডেনে রেখেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়-বাংলাদেশ বা ইংল্যান্ড-বাংলাদেশ ম্যাচ নিয়ে স্থানীয় দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছিল।
এই ম্যাচগুলি যদি শ্রীলঙ্কায় সরে যায়, ইডেন কার্যত তিনটি ম্যাচ হারাবে। গ্রুপ পর্বে তখন আর তেমন আকর্ষণীয় ম্যাচ থাকবে না। ক্রিকেটপ্রেমী ছাড়া সাধারণ দর্শক টিকিট কেটে স্টেডিয়ামে আসবেন কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন।
ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় বিষয় হল ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। আইসিসি-র চেয়ারম্যান এখন জয় শাহ। তিনি বিসিসিআইয়ের প্রাক্তন সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র। এই পরিস্থিতিতে যদি ভারতের মাটি থেকে ম্যাচ সরানো হয়, তা হলে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশ্ন উঠতে পারে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।
যখন ভারত ভবিষ্যতে অলিম্পিক্স আয়োজনের স্বপ্ন দেখছে, তখন এমন বার্তা মোটেই ভালো নয়। অন্য দেশগুলো ভাবতে পারে, সামান্য রাজনৈতিক টানাপড়েন হলেই কি ভারতে খেলতে সমস্যা হবে?
আইসিসিই কি শেষ ভরসা
এই জটিল পরিস্থিতিতে একমাত্র মধ্যস্থতাকারী হতে পারে আইসিসি। অতীতে ভারত বহু বড় টুর্নামেন্ট সফল ভাবে আয়োজন করেছে। বছর দুয়েক আগে এক দিনের বিশ্বকাপে পাকিস্তানও ভারতে এসে নিরাপদে খেলেছে। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। উল্টে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা ভারতের আতিথেয়তার প্রশংসাই করেছেন।
আইসিসি তাই যুক্তি দিতে পারে—যদি রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেও পাকিস্তান ভারতে খেলতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না?
শেষ পর্যন্ত ক্ষতি কার?
সব দিক বিচার করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি খুব একটা নেই। বরং ভারতের ক্ষতিই বেশি। ম্যাচ কমবে, রাজস্ব কমবে, জনপ্রিয়তায় ধাক্কা লাগবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্তরে অস্বস্তিও বাড়বে।
এই কারণেই বলা যায়, বাংলাদেশের অনড় অবস্থান ভারতের জন্যই বেশি চাপের। এখন দেখার, আইসিসি শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটে। বল আপাতত জয় শাহের কোর্টেই।


