সিলেটে ফের এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তিনটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত আরও ১০ জন। শনিবার সকালে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। প্রতিদিনের ব্যস্ত মহাসড়কে মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় চিত্র, স্বাভাবিক যাত্রা পরিণত হয় শোক আর হাহাকারে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সকালের বিভীষিকা
শনিবার, ১৭ জানুয়ারি সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে সিলেটের ওসমানীনগর এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালবেলার ব্যস্ত সময়েই হঠাৎ করে তিনটি বাসের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। সিলেট শহর থেকে ঢাকাগামী এনা পরিবহন ও ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে গাইবান্ধা থেকে সিলেটমুখী শ্যামলী পরিবহনের বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে আশপাশের মানুষ দৌড়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভাঙা কাচ, বাসের ধ্বংসাবশেষ আর আহত যাত্রীদের আর্তনাদ।
ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দুই জন
এই দুর্ঘটনায় দুই জন যাত্রী ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁদের শরীরে আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে উদ্ধারকারীরা কিছু করার আগেই তাঁদের মৃত্যু হয়। নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই যাত্রীদের স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। অনেকেই হাসপাতালে ছুটে যান প্রিয়জনের খোঁজে। দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখে অনেকের চোখে জল চলে আসে, কেউ কেউ স্তব্ধ হয়ে যান।
আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট। স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধার কাজে হাত বাড়িয়ে দেন। আহতদের উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
চিকিৎসকরা জানান, বেশিরভাগ আহত যাত্রীর মাথা, বুক ও পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সকাল থেকেই বাড়তি চাপ পড়ে।
কীভাবে ঘটল এই দুর্ঘটনা?
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দ্রুতগতি এবং অসতর্ক চালনাই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত একটি সড়ক। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত এখানে যাত্রীবাহী বাসের চাপ থাকে বেশি। একটি বাসের নিয়ন্ত্রণ হারানো থেকেই পরপর সংঘর্ষ ঘটে থাকতে পারে।
তবে পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে। বাসগুলোর চালকদের ভূমিকা, গতি এবং সড়কের পরিস্থিতি সব কিছু খতিয়ে দেখা হবে।
পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য
ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনায়েম মিয়া গণমাধ্যমকে জানান, দুর্ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার কারণে সাময়িকভাবে যান চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও বর্তমানে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।”
পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত বাসগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে নেয়, যাতে অন্য যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তদন্তে একটি টিম কাজ শুরু করেছে।
সড়ক দুর্ঘটনা কেন কমছে না?
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো সড়কে দুর্ঘটনার খবর আসে। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোতে বাস দুর্ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনক। অতিরিক্ত গতি, চালকদের দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো, নিয়ম না মানা এবং সড়কের দুর্বল ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার বড় কারণ হয়ে উঠছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও অতীতে একাধিক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবুও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি দেখা যায় না। যাত্রীদের জীবন যেন এখনো নিরাপত্তার বাইরে রয়ে গেছে।
যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
এই দুর্ঘটনা আবারও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই মহাসড়ক ব্যবহার করেন। কেউ কর্মস্থলে যাচ্ছেন, কেউ বাড়ি ফিরছেন, কেউবা প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়েছেন। কিন্তু একটি মুহূর্তের ভুলেই সবকিছু শেষ হয়ে যেতে পারে।
অনেক যাত্রীই অভিযোগ করেন, বাস চালকরা প্রায়ই অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা চলে, ট্রাফিক আইন মানা হয় না। এর ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
দুর্ঘটনা রোধে কী করা জরুরি?
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে একাধিক বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রথমত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, বাস মালিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে, যেন চালকদের ওপর অযথা চাপ না দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ চালনা দেখলে প্রতিবাদ করা, প্রয়োজনে অন্য পরিবহন বেছে নেওয়া—এই ছোট পদক্ষেপগুলোও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
শোকের ছায়া সিলেটে
সিলেটের এই দুর্ঘটনা শুধু দুইটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, অনেক পরিবারের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। যারা আহত হয়েছেন, তাদের জন্য সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। আর যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাদের শোক কোনো শব্দে প্রকাশ করা যায় না।
সড়কে বের হলেই যেন মানুষ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে—এই সহজ চাওয়াটাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্ঘটনা যেন আবারও সবাইকে নাড়া দেয়, দায়িত্বশীল হতে শেখায়, আর ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পথ দেখায়।


