বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬
26.3 C
Jessore
More

    যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার ক্ষমতার লড়াই: নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব রাজনীতি

    বিশ্ব রাজনীতি এখন আর আগের মতো নেই। কূটনৈতিক ভদ্রতা, নীরব সমঝোতা বা পর্দার আড়ালের সমীকরণ—সবকিছুকে ছাপিয়ে সামনে এসেছে একটাই শব্দ, ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া—এই তিন পরাশক্তি এখন প্রকাশ্যেই নিজেদের শক্তি দেখানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কার প্রভাব কোথায় বিস্তৃত হবে, কে কার সীমা পর্যন্ত যাবে, আর কে নতুন বিশ্বব্যবস্থার চালকের আসনে বসবে—এই প্রশ্নগুলোই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে।

    যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও পশ্চিম গোলার্ধের দখলদারি

    ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ঘোষণা দেন—“পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কখনোই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না”—তা আসলে ওয়াশিংটনের নতুন কৌশলের সরাসরি বার্তা। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে সাজাচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নিজস্ব প্রভাববলয়, অর্থাৎ পশ্চিম গোলার্ধ।

    ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের আগের প্রেসিডেন্টরা যেখানে বৈশ্বিক নেতৃত্বের কথা ভাবতেন, সেখানে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি সরাসরি। অভিবাসন, মাদক পাচার, সীমান্ত নিরাপত্তা—যেসব বিষয় সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে, সেগুলোই এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

    ‘ক্ষমতা দ্বারা শাসিত’ বিশ্বের ধারণা

    ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের বক্তব্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট। তার ভাষায়, বর্তমান বিশ্ব “শক্তি দ্বারা শাসিত, প্রভাব দ্বারা শাসিত, ক্ষমতা দ্বারা শাসিত”। অনেক বিশ্লেষক এই নীতিকে হেনরি কিসিঞ্জার ও রিচার্ড নিক্সনের বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তুলনা করছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি বিংশ শতকের শুরুতে থিওডোর রুজভেল্টের সাম্রাজ্যবাদী নীতির আধুনিক সংস্করণ।

    আরও পড়ুন :  প্রতিদিন গান গাওয়ার অভ্যাস বদলে দিতে পারে আপনার শরীর ও মন

    ১৮২৩ সালের মনরো নীতির সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্র বহু আগেই ঘোষণা করেছিল, পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ তারা মানবে না। আজ সেই পুরনো ধারণাই নতুন ভাষায় ফিরে এসেছে।

    ট্রাম্পের আগ্রাসী কৌশল ও আঞ্চলিক প্রভাব

    দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেই ট্রাম্প আশপাশের অঞ্চলগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান করেছেন। ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান, ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদকবাহী নৌযানে হামলা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ওপর শুল্ক চাপানো—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের বার্তা পরিষ্কার।

    এমনকি পানামা খাল, গ্রিনল্যান্ড কিংবা কানাডার অংশ যুক্ত করার মতো বিতর্কিত বক্তব্যও এই শক্তি প্রদর্শনের অংশ। হোয়াইট হাউসের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল বলছে, পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে, কারণ এটিই তাদের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির শর্ত।

    চীনের উত্থান ও ‘মহা পুনর্জাগরণ’-এর স্বপ্ন

    যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের আঙিনায় মনোযোগ দিচ্ছে, তখন চীন ভাবছে পুরো বিশ্বকে নিয়ে। বেইজিংয়ের প্রভাব আজ আর কোনো একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে লাতিন আমেরিকা—প্রায় সর্বত্রই চীনের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

    চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার উৎপাদন ক্ষমতা। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পণ্য তৈরি হয় চীনে। আমাদের হাতে থাকা ফোন, ঘরে পরা কাপড়, অফিসের আসবাব—সবখানেই কোনো না কোনোভাবে চীনের ছাপ রয়েছে।

    বিরল খনিজ ও অর্থনৈতিক অস্ত্র

    চীন শুধু পণ্য উৎপাদনেই থেমে নেই। ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে বেইজিং। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, এমনকি আধুনিক অস্ত্র—সবকিছুর জন্যই এই খনিজ অপরিহার্য।

    আরও পড়ুন :  পরিবর্তনের পথে গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্ত করার আহ্বান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের

    যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের সময় চীন যখন এই খনিজের রপ্তানি সীমিত করে, তখনই বোঝা যায়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই গ্রিনল্যান্ডের মতো খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলের দিকে ওয়াশিংটনের নজর পড়েছে।

    বেল্ট অ্যান্ড রোড: প্রভাব বিস্তারের নীরব কৌশল

    চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাকে যুক্ত করতে চীন বিনিয়োগ করছে বন্দর, রেলপথ, সড়ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এর ফলে অনেক দেশই ধীরে ধীরে চীনের ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে।

    এই মডেল অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছে আকর্ষণীয়। পশ্চিমা রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই উন্নয়ন—এই ধারণাই চীনের প্রভাব বাড়াচ্ছে।

    তাইওয়ান প্রশ্ন ও কৌশলগত ধৈর্য

    ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ চীনকে কি তাইওয়ান আক্রমণে উৎসাহ দেবে—এই প্রশ্ন উঠলেও অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, বেইজিং এখনই সরাসরি হামলার পথে যাবে না। চীন তাইওয়ানকে নিজের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মনে করে এবং ধীরে ধীরে চাপ বাড়িয়ে আলোচনার টেবিলে আনাই তাদের মূল কৌশল।

    শি জিনপিংয়ের লক্ষ্য স্পষ্ট—চীনা জাতির “মহা পুনর্জাগরণ”। তার চোখে বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা আসলে চীনের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ।

    রাশিয়ার ‘নিকট প্রতিবেশ’ ও শক্তির রাজনীতি

    রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে বলেছিলেন “বিশ শতকের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়”। এই একটি বাক্যই রাশিয়ার বর্তমান নীতির গভীর ইঙ্গিত দেয়।

    আরও পড়ুন :  বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম তেলের ভান্ডার দখলের চেষ্টা? ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভিযান ও বিক্ষোভের ছায়া

    ক্রেমলিনের ‘নিকট প্রতিবেশ’ ধারণা অনুযায়ী, সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলো রাশিয়ার প্রভাববলয়ের মধ্যেই পড়ে। কাগজে-কলমে তাদের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হলেও বাস্তবে মস্কো সেখানে নিজের স্বার্থ রক্ষায় অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করতে দ্বিধা করে না।

    ইউক্রেন ও জর্জিয়া: শক্তির নির্মম উদাহরণ

    ইউক্রেন যখন পশ্চিমমুখী পথে হাঁটার চেষ্টা করে, তখনই রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা থেকে শুরু করে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল, পরে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ—সবই এই প্রভাববলয় রক্ষার অংশ।

    একই চিত্র দেখা গেছে জর্জিয়ায়। ২০০৮ সালের যুদ্ধের পর দেশটির প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর থেকে ‘ক্রিপিং অকুপেশন’-এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে সীমান্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

    বিশ্ব কোথায় যাচ্ছে?

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব একসময় সমঅধিকারভিত্তিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু আজ আবার ফিরে আসছে প্রভাববলয়, শক্তির রাজনীতি আর ক্ষমতার দম্ভ।

    যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া—তিন শক্তিই নিজেদের মতো করে বিশ্বকে গড়তে চাইছে। এই প্রতিযোগিতা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তাহলে বিশ্বকে ফিরিয়ে নিতে পারে আরও অস্থির, আরও অন্ধকার এক সময়ের দিকে। প্রশ্ন একটাই—এই ক্ষমতার খেলায় সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ থাকবে?

    লেটেস্ট আপডেট

    যুক্তরাজ্যের চাপে অ্যাপল–গুগলের বড় সিদ্ধান্ত! অ্যাপ স্টোরে আসছে নতুন নিয়ম

    যুক্তরাজ্যে প্রযুক্তি খাতে বড় একটি পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার।...

    টেক্সাসে ভয়াবহ পারিবারিক দ্বন্দ্ব: রাজনৈতিক তর্কের পর মেয়েকে গুলি করলেন বাবা

    পরিবারের মধ্যে তর্ক বা মতবিরোধ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।...

    ভোটের হারেই নির্ধারিত হবে ক্ষমতার সমীকরণ: বিএনপি বনাম জামায়াতের রাজনৈতিক লড়াই

    বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠ এখন...

    এক কাপ গোলাপ চায়ে প্রেমের সকাল: ভ্যালেন্টাইন ডে-তে বিশেষ রোজ টি রেসিপি

    এক কাপ চায়ে যদি ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া যেত, তাহলে...

    সোশাল মিডিয়ায় ডিপফেক আর চলবে না: ৩ ঘণ্টার নিয়মে কড়া বার্তা সরকারের

    ডিপফেক ভিডিও, ভুয়ো ছবি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভ্রান্তিকর...

    বাছাই সংবাদ

    সোশাল মিডিয়ায় ডিপফেক আর চলবে না: ৩ ঘণ্টার নিয়মে কড়া বার্তা সরকারের

    ডিপফেক ভিডিও, ভুয়ো ছবি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভ্রান্তিকর...

    যশোরের ছয় আসনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ছক, ৮২৪ ভোটকেন্দ্রেই সিসি ক্যামেরা স্থাপন

    আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে...

    ভোটের দিন নিরাপত্তা নিয়ে বড় বার্তা! ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও পুলিশের প্রস্তুতি জানালেন ডিআইজি

    এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ শটগানে শুধুমাত্র রাবার বুলেট...
    00:01:45

    নড়াইলে প্রেস ব্রিফিং: নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ প্রস্তুতি জানালেন ডিআইজি

    আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ ঘিরে নড়াইলসহ...

    তীব্র আপত্তির পর সিদ্ধান্ত বদল! ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে নতুন ঘোষণা ইসির

    নানা সমালোচনা ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির পর ভোটকেন্দ্রে...

    যশোরের তরুণদের জন্য বড় ঘোষণা: মেধা ও যোগ্যতাই হবে চাকরির একমাত্র শর্ত

    যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য...

    গোয়ালদাহ বাজারে রাতের অভিযান! বিপুল ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

    যশোরে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ দুই মাদক কারবারিকে...

    অভয়নগরে যৌথবাহিনীর অভিযান, ঘর থেকে মিলল পেট্রোল বোমা ও দেশীয় অস্ত্র!

    যশোরের অভয়নগরে যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র, অ্যামুনেশন, চাইনিজ...

    এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

    জনপ্রিয় ক্যাটাগরি

    Translate »