ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে রাজনীতি আবারও উত্তপ্ত। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে নির্বাচন কমিশন দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা বহু প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আইন, সংবিধান আর বাস্তব সিদ্ধান্তের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই—আইন কি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে?
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কের শুরু
বাংলাদেশের সংবিধান খুব স্পষ্ট। কেউ যদি বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব রাখেন, তাহলে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। নির্বাচন সংক্রান্ত আইনেও বলা আছে, প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে সেটি ত্যাগ করতে হবে এবং হলফনামায় বিষয়টি উল্লেখ করতে হবে।
কিন্তু এবারের নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার পরও প্রায় দুই ডজন প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নিতে বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—আইনের ব্যাখ্যা কি বদলে গেল, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতায় কমিশন নমনীয় হলো?
রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ কতটা জোরালো
নির্বাচনের আপিল শুনানির শেষ দিনে কমিশনের দেওয়া একের পর এক সিদ্ধান্ত আগুনে ঘি ঢালে। অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের প্রার্থিতা বহাল রাখা হয়। শুধু দু–একজন ছাড়া বাকিরা সবাই বৈধতা পেয়ে যান।
এই সময়েই বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক, কমিশনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি এবং টানা রাজনৈতিক তৎপরতা বিষয়টিকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে। রাজনৈতিক মহলে অনেকেই মনে করছেন, এই চাপ উপেক্ষা করা কমিশনের জন্য সহজ ছিল না।
বিএনপি, জামায়াত ও আপিল নাটক
কুমিল্লা, ফেনী, মানিকগঞ্জসহ কয়েকটি আসনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে একের পর এক আপিল হয়। কোথাও বিএনপি প্রার্থী, কোথাও জামায়াত প্রার্থী অভিযোগ তুলেছেন। আবার কোথাও রিটার্নিং অফিসার প্রার্থিতা বাতিল করলেও আপিলে তা ফিরে এসেছে।
সবচেয়ে আলোচিত হয়ে ওঠে ফেনী-৩ আসনের ঘটনা। সেখানে অভিযোগ ওঠে, একজন প্রার্থী মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবি করলেও বাস্তবে বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন। এমন অভিযোগ শুনানিতে উত্তেজনাও ছড়ায়। তবু শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড ঠিক করে অধিকাংশ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে।
নির্বাচন কমিশনের নতুন মানদণ্ড
এই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের ঠিক করা একটি নতুন ক্রাইটেরিয়া। কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনের আগে যারা বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য আবেদন করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট ফি জমা দিয়েছেন, তাঁদের প্রার্থিতা বৈধ ধরা হবে।
এখানেই মূল প্রশ্ন। আবেদন করলেই কি নাগরিকত্ব ত্যাগ সম্পন্ন হয়ে যায়? অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, আবেদন আর চূড়ান্ত অনুমোদন এক বিষয় নয়। কিন্তু আইনে এই জায়গাটিই স্পষ্টভাবে বলা নেই। আর এই অস্পষ্টতার সুযোগেই কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আইনের অস্পষ্টতা ও বিশেষজ্ঞ মত
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে কঠোর হলেও নির্বাচনী আইন সেই কঠোরতাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে না। হলফনামায় তথ্য দেওয়ার কথা বলা আছে, কিন্তু নাগরিকত্ব ত্যাগের চূড়ান্ত প্রমাণ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
এই ফাঁকফোকর ব্যবহার করেই এবারের নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা প্রার্থীরা সুযোগ পেয়ে গেছেন। আইনের ভাষা পরিষ্কার না হলে এমন সিদ্ধান্ত বারবার প্রশ্নের মুখে পড়বে—এটাই বিশেষজ্ঞদের মত।
ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বৈধতা বিতর্ক
দ্বৈত নাগরিকত্বের পাশাপাশি আরেকটি বড় আলোচনা হলো ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বৈধতা। আপিলের মাধ্যমে শত শত প্রার্থী তাদের মনোনয়ন ফিরে পেয়েছেন। এর মধ্যে ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা বেশ কয়েকজনও রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনাররাই স্বীকার করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে মন খারাপ করেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আইন যেখানে সুযোগ দিয়েছে, সেখানে তাদের হাত বাঁধা ছিল—এমন বক্তব্যও এসেছে কমিশনের পক্ষ থেকে।
চট্টগ্রামের দুটি আসনে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত এই বিতর্ককে আরও বাড়িয়েছে। এক আসনে ঋণখেলাপির কারণে প্রার্থিতা বাতিল, আরেক আসনে একই অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রার্থিতা বহাল। সাধারণ ভোটারের চোখে এসব সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
সব বিতর্কের মাঝেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার দাবি করেছেন, কোনো পক্ষপাত করা হয়নি। তাদের মতে, তারা আইন বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারও প্রতি আলাদা সুবিধা দেওয়া হয়নি বলেও তারা জোর দিয়ে বলছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সিদ্ধান্তের সময় ও প্রেক্ষাপট অনেক সন্দেহ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বৈঠকের পরপরই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায় আসা সেই সন্দেহকে আরও গভীর করেছে।
সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় দাঁড়াল
নির্বাচন মানেই মানুষের আশা, ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন। কিন্তু যখন আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সেই আস্থায় চিড় ধরে। দ্বৈত নাগরিকত্ব বা ঋণখেলাপির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে একেকজনের জন্য একেক রকম সিদ্ধান্ত মানুষকে বিভ্রান্ত করে।
অনেকে বলছেন, হয় আইন আরও স্পষ্ট করতে হবে, নয়তো সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা আরও স্বচ্ছ করতে হবে। না হলে প্রতিবার নির্বাচন এলেই একই অভিযোগ, একই বিতর্ক ঘুরেফিরে আসবে।
শেষ কথা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই নয়, এটি আইনের প্রয়োগ আর নৈতিকতারও পরীক্ষা। দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বৈধতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার উত্তর শুধু নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যে শেষ হবে না। ভবিষ্যতে আইন সংস্কার ও স্বচ্ছতা না এলে এই বিতর্ক আরও বড় আকার নেবে—এটাই এখন অনেকের আশঙ্কা।


