যশোরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে জমে উঠেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। ছয়টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী ৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশেক হাসান প্রার্থীদের হাতে নিজ নিজ প্রতীক তুলে দেন। এই প্রতীক পাওয়ার মধ্য দিয়েই বৃহস্পতিবার থেকে পুরোদমে শুরু হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা। শহর থেকে গ্রাম, হাটবাজার থেকে মহল্লা—সবখানেই এখন নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
প্রতীক বরাদ্দে উৎসবের আমেজ, মাঠে নামার প্রস্তুতি প্রার্থীদের
প্রতীক বরাদ্দের দিন সকাল থেকেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য। প্রার্থীদের সঙ্গে এসেছিলেন দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা। সবার চোখে ছিল আত্মবিশ্বাস আর প্রত্যাশার ঝিলিক। প্রতীক হাতে পেয়ে অনেক প্রার্থীই জানান, জনগণের কাছে যাওয়ার জন্য তারা এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে শান্তিপূর্ণভাবে প্রচারণা চালানোর অঙ্গীকারও করেন তারা।
যশোর-১ (শার্শা) আসনে চার প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা
যশোর-১ আসনে এবারের নির্বাচনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আজিজুর রহমান পেয়েছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক। জাতীয় পার্টির মো. জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চলের প্রতীক লাঙ্গল। বিএনপির প্রার্থী মো. নুরুজ্জামান লিটন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে নামছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. বক্তিয়ার রহমান পেয়েছেন হাতপাখা প্রতীক। এই আসনে ভোটের লড়াই বেশ জমজমাট হবে বলেই মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী
যশোর-২ আসনে এবার লড়ছেন মোট আটজন প্রার্থী, যা ছয় আসনের মধ্যে সর্বাধিক। বিএনপির মোছা. সাবিরা সুলতানা পেয়েছেন ধানের শীষ। জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দীন ফরিদ দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইসলামী আন্দোলনের মো. ইদ্রিস আলী পেয়েছেন হাতপাখা। বাসদের মো. ইমরান খানের প্রতীক মই। বিএনএফের মো. শামসুল হক পেয়েছেন টেলিভিশন এবং এবি পার্টির রিপন মাহমুদ পেয়েছেন ঈগল প্রতীক।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মো. জহুরুল ইসলাম পেয়েছেন ঘোড়া এবং মো. মেহেদী হাসান পেয়েছেন ফুটবল প্রতীক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মো. জহুরুল ইসলাম মনোনয়ন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত না হওয়ায় তাকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
যশোর-৩ (সদর) আসনে ছয় প্রার্থীর প্রতিযোগিতা
যশোর সদর আসনে মোট ছয়জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। বিএনপির অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের মুহাম্মদ শোয়াইব হোসেন পেয়েছেন হাতপাখা। জামায়াতে ইসলামীর মো. আব্দুল কাদেরের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা। জাতীয় পার্টির মো. খবির গাজী লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। জাগপার মো. নিজামুদ্দিন অমিত পেয়েছেন চশমা এবং সিপিবির মো. রাশেদ খান পেয়েছেন কাস্তে প্রতীক। সদর আসনে ভোটের হিসাব-নিকাশ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আগ্রহ তুঙ্গে।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে সাত প্রার্থীর লড়াই
এই আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতীক পেয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী এম. নাজিম উদ্দীন আল-আজাদ পেয়েছেন মোটরসাইকেল প্রতীক। ইসলামী আন্দোলনের বায়েজীদ হোসাইন পেয়েছেন হাতপাখা। বিএনপির মতিয়ার রহমান ফারাজী পেয়েছেন ধানের শীষ। খেলাফত মজলিসের মাওলানা আশেক এলাহী পেয়েছেন দেয়ালঘড়ি। জামায়াতে ইসলামীর মো. গোলাম রসুল পেয়েছেন দাঁড়িপাল্লা। জাতীয় পার্টির মো. জহুরুল হক পেয়েছেন লাঙ্গল এবং বিএমজেপির সুকৃতি কুমার মণ্ডল পেয়েছেন রকেট প্রতীক।
যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে পাঁচ প্রার্থী মাঠে
মণিরামপুর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচজন প্রার্থী। জাতীয় পার্টির এম. এ. হালিম পেয়েছেন লাঙ্গল। জামায়াতে ইসলামীর গাজী এনামুল হক পেয়েছেন দাঁড়িপাল্লা। ইসলামী আন্দোলনের মো. জয়নাল আবেদীন পেয়েছেন হাতপাখা। বিএনপির রশীদ আহমাদ পেয়েছেন ধানের শীষ। স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেন পেয়েছেন কলস প্রতীক। এই আসনে প্রচারণা ঘিরে বেশ উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে পাঁচ প্রার্থীর প্রতীক বরাদ্দ
কেশবপুর আসনেও পাঁচজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জাতীয় পার্টির জি. এম. হাসান লাঙ্গল প্রতীক পেয়েছেন। বিএনপির মো. আবুল হোসেন আজাদ পেয়েছেন ধানের শীষ। এবি পার্টির মো. মাহমুদ হাসান পেয়েছেন ঈগল। জামায়াতে ইসলামীর মো. মোক্তার আলী পেয়েছেন দাঁড়িপাল্লা এবং ইসলামী আন্দোলনের মো. শহিদুল ইসলাম পেয়েছেন হাতপাখা প্রতীক।
নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনের বার্তা ও প্রস্তুতি
প্রতীক বরাদ্দ অনুষ্ঠান শেষে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশেক হাসান জানান, যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনে চূড়ান্তভাবে ৩৫ জন প্রার্থীকে প্রতীক দেওয়া হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যশোরে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি সবাইকে নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রশাসন সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানান।
অনুষ্ঠানে সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম রাকিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সব মিলিয়ে প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে যশোরে নির্বাচন এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। ভোটারদের মাঝেও বাড়ছে আগ্রহ ও আলোচনা। কে জিতবে, কে হারবে—তার উত্তর মিলবে ভোটের দিন। এখন শুধু অপেক্ষা নির্বাচনী প্রচারণার উত্তাপ আর গণতন্ত্রের উৎসব দেখার।


