শহরের গণ্ডি পেরিয়ে একেবারে চুপিসারে বিয়ে। তারপর আচমকাই সোশাল মিডিয়ায় নিজেই ঘোষণা। মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। বিজেপির তারকা বিধায়ক ও অভিনেতা হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে এখন উত্তাল রাজ্য রাজনীতি থেকে টলিপাড়া। বিশেষ করে পাত্রী যে তাঁর থেকে বয়সে প্রায় ২৮ বছরের ছোট এবং পেশায় তাঁরই আপ্তসহায়ক, তা সামনে আসতেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকেই সোশাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, চায়ের ঠেক—সব জায়গায় একটাই আলোচনা। হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে শুরু হলো নতুন দাম্পত্য ইনিংস। তবে এই বিয়ের খবরে শুধু অভিনন্দন নয়, প্রশ্নও উঠেছে অনেক। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হলেও জনজীবনের মানুষের ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্ত যে আলোচনার বাইরে থাকে না, তা আবারও প্রমাণিত।
হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে কেন এত বিতর্ক
হিরণ চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতির পাশাপাশি অভিনয় জগতেও পরিচিত মুখ। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান যেমন নজর কেড়েছে, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনও বারবার এসেছে আলোচনায়। বছরখানেক আগেই শোনা গিয়েছিল তাঁর জীবনে নতুন কারও আগমন ঘটেছে। তবে তখন যাঁকে তাঁর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল, তিনি ছিলেন খড়্গপুরের স্থানীয় বাসিন্দা। সেই সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা হলেও প্রকাশ্যে কিছু বলেননি হিরণ।
কিন্তু এবারে পরিস্থিতি আলাদা। ২৮ বছরের ছোট এক তরুণীর সঙ্গে বিয়ের খবর সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠেছে বয়সের ফারাক, সম্পর্কের সমীকরণ এবং আইনি দিক নিয়ে। অনেকেই হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্টের প্রসঙ্গ তুলেছেন। কেউ আবার বলছেন, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। আবার অনেকে প্রথম পক্ষের স্ত্রী ও সন্তানের অনুভূতির কথাও সামনে আনছেন।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী অনিন্দিতার প্রতিক্রিয়া
হিরণের প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলেছেন। তাঁর প্রতিক্রিয়ায় নতুন করে বিতর্কে ঘি পড়েছে। যদিও তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি, তবে তাঁর বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে এই বিয়ে তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত করেছে।
এর আগে ২০২২ সালে অনিন্দিতার একটি সোশাল মিডিয়া পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল। সেই পোস্টে বাবার সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, দায়িত্বহীনতার ইঙ্গিত মিলেছিল। তখন বিষয়টি অনেকেই অতটা গুরুত্ব দেননি। কিন্তু বর্তমান ঘটনার প্রেক্ষিতে সেই পোস্ট নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাবা-মেয়ের দূরত্বের গল্প
হিরণ ও অনিন্দিতার একমাত্র সন্তান নিয়াসা চট্টোপাধ্যায়। বয়স মাত্র ১৯। বাবা রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর থেকেই খড়্গপুরে থাকাকালীন তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে টলিপাড়ার অন্দরমহলে কান পাতলেই শোনা যেত। বাবার ব্যস্ততা, রাজনৈতিক চাপ এবং পারিবারিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে সম্পর্ক যে আগের মতো ছিল না, তা অনেকের কাছেই অনুমেয়।
মঙ্গলবার দুপুরে হিরণের দ্বিতীয় বিয়ের খবর প্রকাশ্যে আসার পর সেই জল্পনায় আর কোনও সন্দেহ রইল না। গত ২৪ ঘণ্টায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে মেয়ের কথা। মানুষ জানতে চেয়েছেন, এই ঘটনায় নিয়াসার অবস্থান কী।
নিয়াসা চট্টোপাধ্যায়ের আবেগঘন ঘোষণা
সব প্রশ্নের মাঝেই বুধবার সোশাল মিডিয়ায় বড় ঘোষণা করলেন নিয়াসা চট্টোপাধ্যায়। নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে তিনি মায়ের সঙ্গে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেই ভিডিওর ক্যাপশনেই স্পষ্ট করে দেন, তাঁর জীবনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তাঁর মা।
নিয়াসার লেখা কয়েকটি লাইন মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি লেখেন, যতদূর তাঁর মনে পড়ে, বহুদিন ধরেই মা ও মেয়ে একে অপরের ভরসা। ভালোবাসা, মায়া আর যত্ন দিয়ে মা একাই সব দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু মা নন, তাঁর কাছে মা-ই বাবা, পথপ্রদর্শক এবং সবচেয়ে বড় সমর্থক।
এই পোস্টে কোথাও বাবার নাম নেই। কিন্তু সেই নীরবতাই অনেক কথা বলে দিচ্ছে। নেটিজেনদের একাংশ মনে করছেন, এই পোস্ট আসলে বাবার সিদ্ধান্তের প্রতি নীরব প্রতিবাদ।
সোশাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়ার বন্যা
নিয়াসার পোস্টের পর থেকেই সোশাল মিডিয়ায় আবেগের ঢেউ। কেউ নিয়াসার সাহসের প্রশংসা করেছেন। কেউ আবার মা অনিন্দিতার জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই লিখেছেন, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ বা দূরত্বের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সন্তানকেই।
আবার কেউ কেউ বলছেন, পরিবারের বিষয়কে প্রকাশ্যে আনা ঠিক হয়নি। তবে অধিকাংশ মানুষই নিয়াসার পাশে দাঁড়িয়েছেন। কারণ তাঁর বয়স, মানসিক অবস্থান এবং পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে সহানুভূতি পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
নিয়াসার বর্তমান জীবন ও পড়াশোনা
নিয়াসা চট্টোপাধ্যায় বর্তমানে মধ্য কলকাতার একটি কলেজে মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছেন। বয়স কম হলেও তাঁর কথাবার্তায় পরিণত মনোভাব স্পষ্ট। মা-কেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখার সিদ্ধান্ত যে সহজ ছিল না, তা তাঁর লেখার মধ্যেই বোঝা যায়।
মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসেবে হয়তো তিনি মানুষের আবেগ, সম্পর্ক এবং মানসিক চাপ ভালোই বোঝেন। তাই নিজের অনুভূতি লুকিয়ে না রেখে স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত তাঁর আত্মসম্মানের জায়গা থেকেই এসেছে।
ব্যক্তিগত জীবন বনাম জনজীবনের দায়
এই পুরো ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে, একজন জনজীবনের মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কতটা ব্যক্তিগত থাকে। হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের বিয়ে আইনত বৈধ কিনা, তা আদালত দেখবে। কিন্তু নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক প্রভাব—এসব প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
একদিকে নতুন দাম্পত্য জীবনের সূচনা। অন্যদিকে মেয়ের প্রকাশ্য আবেগঘন বার্তা। এই দুই বিপরীত চিত্রই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সময়ই বলবে, এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।
শেষ কথা
হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিঃসন্দেহে তাঁর জীবনের বড় সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যে শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়াসার পোস্টেই স্পষ্ট। মা-মেয়ের বন্ধন, বাবার সঙ্গে দূরত্ব এবং নতুন সম্পর্কের বাস্তবতা—সব মিলিয়ে এই ঘটনা শুধু গসিপ নয়, বরং সম্পর্কের জটিল সমীকরণের এক বাস্তব ছবি।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় নিয়াসার সেই এক লাইন—“তুমিই আমার জীবনের নায়ক মা।” এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক কন্যার যন্ত্রণা, শক্তি আর ভালোবাসার গল্প।


