ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী মাঠে পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘদিন পর সরাসরি মাঠপর্যায়ের নির্বাচনী প্রচারে নেমে প্রথম দিনেই নজিরবিহীন কর্মসূচি পালন করেছেন তিনি। মাত্র ১৬ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত সাতটি জেলার জনসমাবেশে অংশ নিয়ে ভোটের রাজনীতিতে শক্ত বার্তা দিলেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রথম নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করেন তারেক রহমান। শুরু থেকেই জনসমাগমে ছিল চোখে পড়ার মতো ভিড়। বক্তব্যে তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
সিলেটের পর বিকেল ৩টায় মৌলভীবাজারে দ্বিতীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন তিনি। এরপর সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় হবিগঞ্জে এবং রাত সাড়ে ১০টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয় আরও দুটি নির্বাচনী জনসভা। প্রতিটি স্থানেই নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
রাত যত গভীর হয়েছে, প্রচারের গতি ততই বেড়েছে। রাত সোয়া ১২টায় কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারম্যান। এরপর রাত ৩টার দিকে নরসিংদীর পৌর পার্কসংলগ্ন মাঠে পৌঁছে আরেকটি নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেন তিনি।
প্রথম দিনের শেষ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয় নারায়ণগঞ্জে। ভোররাত ৪টা ১৬ মিনিটে নারায়ণগঞ্জের একটি মাঠে বক্তব্য দিয়ে শেষ করেন দিনের প্রচার। টানা সাতটি জেলার এই দীর্ঘ সফর শেষে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
প্রতিটি সমাবেশেই তারেক রহমান ধানের শীষ প্রতীকের পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতায় থাকা শরিক দলগুলোর প্রার্থীদের পক্ষেও ভোট চান। তিনি বলেন, দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার গঠনের আহ্বান। তিনি জানান, বিএনপি ক্ষমতায় এলে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে।
নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে তারেক রহমান একাধিক উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি জোরদার করা হবে। এর মাধ্যমে কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া তিনি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর ঘোষণা দেন। এসব কার্ডের মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার এবং কৃষকরা সরাসরি সরকারি সুবিধা পাবেন বলে জানান তিনি।
বেকার সমস্যা সমাধানে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন বিএনপির চেয়ারম্যান। যুব সমাজকে দক্ষ করে তুলতে আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
ধর্মীয় নেতাদের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানী ভাতা চালু করা হবে। এতে করে তারা সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবেন।
টানা কর্মসূচির কারণে শেষ কয়েকটি সমাবেশ ভোররাত পর্যন্ত গড়ায়। এ জন্য নেতাকর্মীদের অপেক্ষা করিয়ে রাখার বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, আপনাদের ধৈর্য ও ভালোবাসাই আমাকে শক্তি দেয়।
এই বক্তব্যে সমাবেশস্থলে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বিএনপির মিডিয়া সেলের অন্যতম সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, নির্বাচনী প্রচারের প্রথম দিনেই সাতটি জনসমাবেশ শেষ করে তারেক রহমান ঢাকায় ফিরেছেন। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ গাউসিয়া এলাকায় শেষ সমাবেশ শেষে ভোররাতের কিছু সময় পর তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
মিডিয়া সেল আরও জানায়, সিলেট থেকে শুরু হওয়া এই টানা সফরের প্রতিটি সমাবেশেই বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে। এতে বোঝা যায়, নির্বাচনের আগে মাঠে বিএনপির প্রতি মানুষের আগ্রহ ও সাড়া ক্রমেই বাড়ছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুক্রবার তারেক রহমান নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ আসনের ভাসানটেকের বিআরবি ময়দানে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। এই সমাবেশ ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী প্রচারের প্রথম দিনেই টানা সাত জেলার সমাবেশে অংশ নিয়ে তারেক রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বিএনপি এবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠে শক্ত অবস্থান নিতে চায়।
১৬ ঘণ্টায় সাত জেলার এই সফর শুধু একটি প্রচার কর্মসূচি নয়, বরং এটি বিএনপির নির্বাচনী কৌশলের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। দীর্ঘ সময় ধরে মাঠে অনুপস্থিত থাকার পর এমন সক্রিয় প্রচার বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, তারেক রহমানের এমন ধারাবাহিক কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই জনসমর্থন শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে কতটা প্রতিফলিত হয়।


