বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাষ্ট্রীয় সংস্কার বিষয়ক গণভোটকে ঘিরে নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকা অনুযায়ী, দেশের মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৫ জন নাগরিক এবারের নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার ২২ জানুয়ারি আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যা প্রকাশ করে। ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে এই তালিকাকে চূড়ান্ত করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা ত্রুটি না থাকে। কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, এবারের ভোটার তালিকা প্রস্তুতে স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন। নারী ভোটার রয়েছেন ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন। পাশাপাশি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ১ হাজার ১২০ জন হিজড়া ভোটার। এই তথ্য দেশের ভোটার কাঠামোর একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এবারের নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার সংক্রান্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত। এর ফলে ভোটারদের দুটি ভিন্ন বিষয়ে ভোট দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে ভোট গ্রহণ ও গণনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। প্রয়োজন হলে ভোটকেন্দ্রে সময় ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হতে পারে।
৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ভোটার সংখ্যার দিক থেকে বড় পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। গাজীপুর-২ সংসদীয় আসনে দেশের সর্বোচ্চ ভোটার রয়েছেন। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। অন্যদিকে ঝালকাঠি-১ আসনটি সবচেয়ে কম ভোটার নিয়ে গঠিত হয়েছে, যেখানে মোট ভোটার ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। এই বৈষম্য মাথায় রেখেই ব্যালট পেপার মুদ্রণ এবং ভোটকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি আসনের ভোটার সংখ্যা অনুযায়ী ব্যালট পেপার ছাপানোর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, কেন্দ্রের নিরাপত্তা, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণসহ প্রাথমিক প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। যেহেতু ভোটারদের দুটি আলাদা ব্যালটে ভোট দিতে হবে, তাই কেন্দ্রগুলোতে আলাদা বুথ ও স্পষ্ট নির্দেশনার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
ইসি আগেই সতর্ক করেছে যে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় ভোট গ্রহণ ও গণনায় অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। ভুল এড়াতে গণনার প্রতিটি ধাপে বিশেষ নজরদারি থাকবে। প্রয়োজনে ফলাফল ঘোষণার সময়ও কিছুটা বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে কমিশন। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি ভোট সঠিকভাবে গণনা নিশ্চিত করা।
নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এনআইডি কার্ড সংগ্রহের নামে হয়রানি, ভোটারদের উপহার দেওয়া বা কোনো ধরনের প্রলোভন দেখানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এমন অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে বা আদালতের নির্দেশনা এলে তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা হবে। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোকে এ বিষয়ে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব বা বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হবে।
এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা চলছে। তরুণ ভোটাররা ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিয়েও নতুন সম্ভাবনার কথা উঠছে। এসব বিষয় নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভোটারদের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘ্ন ভোটদান নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় সভা করছে নির্বাচন কমিশন। কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছে ইসি।
সব মিলিয়ে, ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের এই চূড়ান্ত তালিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, ভোটারদের সচেতনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একটি গ্রহণযোগ্য ও স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ভোটের দিন সাধারণ মানুষ কতটা উৎসাহ নিয়ে কেন্দ্রে হাজির হন এবং তাঁদের রায় কীভাবে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।


