আমেরিকার অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। এবার সেই বিতর্কের কেন্দ্রে এক নিষ্পাপ পাঁচ বছরের শিশু। প্রিস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথেই তাকে কার্যত ‘গ্রেপ্তার’ করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়েছে অভিবাসন দপ্তর। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এই ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে মার্কিন সমাজের বড় অংশ। মানবাধিকার, শিশুসুরক্ষা এবং নৈতিকতার প্রশ্নে আবারও কাঠগড়ায় ট্রাম্পের ‘হার্ডলাইন’ ইমিগ্রেশন পলিসি।
ঘটনাটি ঘটেছে আমেরিকার মিনেসোটায়। বয়স মাত্র পাঁচ বছর। প্রতিদিনের মতো প্রিস্কুল থেকে বাড়ি ফেরে শিশুটি। অভিযোগ, সেই সুযোগকেই ব্যবহার করেছে অভিবাসন আধিকারিকরা। প্রিস্কুল সূত্রে দাবি করা হয়েছে, শিশুটিকে একপ্রকার টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাকে দিয়ে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ানো হয়। শিশুটির বাবা দরজা খুলতেই গোটা পরিবারকে আটক করা হয়।
এই ঘটনার পর শিশুটিকে তার বাবার সঙ্গে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। একটি ছোট শিশুকে অপরাধীর মতো ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ছবি ভাইরাল হয়ে যায়। প্রশ্ন উঠতে থাকে, আইন প্রয়োগের নামে কি মানবিকতা পুরোপুরি ভুলে গেল প্রশাসন?
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, শিশুটির পরিবার ২০২৪ সালে ইকুয়েডর থেকে আমেরিকায় আসে। প্রশাসনের দাবি, তারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া আমেরিকায় বসবাস করছিল। সেই কারণেই পরিবারটিকে আটক করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগ থাকলেও পাঁচ বছরের শিশুকে এভাবে আটক করা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন আইন প্রয়োগ আর শিশুর মৌলিক অধিকারের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা থাকা উচিত। এই ঘটনায় সেই সীমারেখা লঙ্ঘিত হয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অভিবাসন প্রশ্নে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন। সীমান্তে কড়াকড়ি, ডিটেনশন সেন্টার, পরিবার বিচ্ছিন্ন করার মতো সিদ্ধান্ত আগেও সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এবার সেই নীতির বলি হল পাঁচ বছরের শৈশব। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, শিশুকে কখনওই আইন প্রয়োগের হাতিয়ার বানানো যায় না। একটি শিশুর নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন মার্কিন সমাজের বড় অংশ। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে কীভাবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতারাও সরব হয়েছেন। প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এক্স হ্যান্ডেলে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ও একটা নিষ্পাপ শিশু। ওর জায়গা ডিটেনশন সেন্টারে নয়, পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে। শিশুকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা অমানবিক। আমি রাগে ফুঁসছি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনের আগে এই ধরনের ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। কারণ নারী ও শিশু অধিকার ইস্যুতে মার্কিন ভোটাররা অত্যন্ত সংবেদনশীল।
যদিও মিনেসোটার স্থানীয় প্রশাসন অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, অভিবাসন দপ্তর কোনও শিশুকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে না। প্রশাসনের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিশুটির নিরাপত্তা এবং মঙ্গলের কথাই ভাবা হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য।
তবে এই সাফাই মানতে নারাজ মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের বক্তব্য, যদি শিশুর মঙ্গলই লক্ষ্য হত, তাহলে তাকে প্রিস্কুল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। আইন প্রয়োগের আরও মানবিক উপায় থাকতে পারত।
এটাই প্রথম নয়। এর আগেও মিনেসোটা এবং অন্যান্য রাজ্যে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের আটক করার অভিযোগ উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কালে এমন একাধিক ঘটনার নজির রয়েছে। পরিবার বিচ্ছিন্ন করার নীতি একসময় আন্তর্জাতিক স্তরেও সমালোচিত হয়েছিল।
এই ধারাবাহিকতা দেখেই অনেকের আশঙ্কা, কঠোর অভিবাসন নীতির নামে শিশুদের মানসিক ও সামাজিক ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা সেই ভাবমূর্তিতে বড় প্রশ্নচিহ্ন লাগাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি নজর কাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের শক্তি শুধু কঠোর আইন নয়, মানবিক সিদ্ধান্তেও প্রকাশ পায়। পাঁচ বছরের একটি শিশুকে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো সেই মানবিকতার অভাবকেই সামনে আনছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য আমেরিকাকে আবার “মহান” করে তোলা। কিন্তু সেই পথে যদি নিষ্পাপ শৈশব বলি যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। অবৈধ অভিবাসন একটি বাস্তব সমস্যা, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে তার সমাধান কি শিশুদের গ্রেপ্তার করে?
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ভবিষ্যতে আমেরিকা কোন পথে হাঁটবে, কঠোরতার নাকি মানবিকতার, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড়।


