টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মানেই শুধু ক্রিকেট নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিপুল অর্থ, ব্যবসা আর দেশের ভাবমূর্তি। ঠিক এই জায়গাতেই এখন বড় প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশ। ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে শুধু কূটনীতি বা নিরাপত্তা নয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি।
বিশ্বকাপ শুরুর আর হাতে গোনা কিছুদিন বাকি। এই সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, অন্তর্বর্তী সরকার আর আইসিসির মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা হলেও বাস্তবতা হলো, সূচি বদলানোর সুযোগ প্রায় নেই। আইসিসিও পরিষ্কার করে জানিয়েছে, এই মুহূর্তে ভেন্যু পরিবর্তন করা বাস্তবসম্মত নয়। এর ফল হিসেবে যদি বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে না খেলে, তাহলে ক্ষতির অঙ্কটা মোটেও ছোট হবে না।
সাধারণ দর্শকের চোখে বিশ্বকাপ মানে রোমাঞ্চ, ছক্কা আর উইকেট। কিন্তু বোর্ড আর ক্রিকেটারদের কাছে এটি বড় আয়ের উৎস। আইসিসির প্রতিটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট থেকেই অংশগ্রহণকারী বোর্ডগুলো মোটা অঙ্কের অর্থ পায়।
শুধু বিশ্বকাপে অংশ নিলেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পেত প্রায় চার কোটি টাকার মতো অর্থ। ডলারে হিসাব করলে এটি প্রায় তিন লাখ মার্কিন ডলার। এটি একেবারে নিশ্চিত আয়, কোনো ম্যাচ জিততে না পারলেও।
আর যদি দল ভালো করে, সেরা ১২-এর মধ্যে জায়গা করে নেয়, তাহলে সেই অঙ্ক গিয়ে দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ কোটিরও বেশি। অর্থাৎ প্রায় চার লাখ পঞ্চাশ হাজার ডলার। বোর্ডের বাজেটের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
বিশ্বকাপে না খেললে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ আসে ম্যাচ ফি, পারফরম্যান্স বোনাস আর প্রাইজমানি থেকে।
একটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেললেই একজন ক্রিকেটার ন্যূনতম আড়াই লাখ টাকা পান। বিশ্বকাপে ম্যাচ সংখ্যা বেশি, চাপ বেশি, কিন্তু আয়ও বেশি। বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ালে এই পুরো সুযোগটাই হারিয়ে যাবে।
এর সঙ্গে যোগ হয় পারফরম্যান্স বোনাস। ভালো খেললে যে বাড়তি অর্থ আসে, সেটিও আর পাওয়া যাবে না। অনেক ক্রিকেটারের জন্য বিশ্বকাপের আয় মানে সারা বছরের আর্থিক নিরাপত্তা।
২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ছিল প্রাইজমানির দিক থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। রানার্সআপ দল পেয়েছিল প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার ডলার। সেমিফাইনালে ওঠা দলগুলো পেয়েছিল সাত লাখ ৮৭ হাজার ডলার করে।
এমনকি যারা দ্বিতীয় রাউন্ডও পার হতে পারেনি, তারাও পেয়েছিল প্রায় তিন লাখ ৮২ হাজার ডলার। নবম থেকে দ্বাদশ স্থানে থাকা দলগুলোর জন্য ছিল প্রায় দুই লাখ ৪৭ হাজার ডলার। শেষের দিকের দলগুলোকেও দেওয়া হয়েছিল দুই লাখ ২৫ হাজার ডলার করে।
এর বাইরে প্রতিটি ম্যাচ জয়ের জন্য আলাদা করে ৩১ হাজার ডলারের মতো বোনাস ছিল। বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপেই না খেলে, তাহলে এই পুরো অর্থনৈতিক সম্ভাবনাই একেবারে শূন্য হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের জন্য এটি শুধু সম্মানের প্রশ্ন নয়, সরাসরি আর্থিক ক্ষতির বিষয়। আইসিসি থেকে অংশগ্রহণ ফি হিসেবে যে তিন থেকে পাঁচ লাখ ডলার পাওয়ার কথা, সেটি আর পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় চার থেকে ছয় কোটি টাকা। বোর্ডের দৈনন্দিন কার্যক্রম, খেলোয়াড়দের বেতন, ঘরোয়া ক্রিকেট পরিচালনা—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই ভারতীয় উপমহাদেশে ভালো টিআরপি। বাংলাদেশ না খেললে টেলিভিশন দর্শক কমবে, এতে বিজ্ঞাপনদাতারাও আগ্রহ হারাতে পারেন।
সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো বড় দর্শকভিত্তির একটি দল না থাকলে টুর্নামেন্টের সামগ্রিক বাণিজ্যিক মূল্যও কমে যাবে। স্পন্সররা তখন নতুন করে ভাববে, বিনিয়োগ কতটা লাভজনক।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বকাপ মানে আইসিসির জন্যও ক্ষতি। তার মতে, প্রায় ২০ কোটি দর্শক কমে যেতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, সম্প্রচার স্বত্ব আগেই বিক্রি হয়ে যাওয়ায় আইসিসির সরাসরি ক্ষতি তুলনামূলক কম। বরং বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সম্প্রচারক সংস্থা আর বিজ্ঞাপনদাতারা।
এই পুরো সংকটের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ভারত-বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দুই দেশের মধ্যে ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ। ফলে বাংলাদেশ খেললেও সাধারণ দর্শকের পক্ষে খেলা দেখতে যাওয়া সহজ ছিল না।
এর মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সরকারের প্রশ্ন, একজন ক্রিকেটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে পুরো দল, সাংবাদিক আর দর্শকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
এই কারণেই বাংলাদেশ সরকার ও বিসিবি একসুরে দাবি জানিয়েছে, ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হোক। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বারবার বলেছেন, দেশের মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
আইসিসি যদিও বলছে, নিরপেক্ষ নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ভেন্যু নির্ধারণ করা হয়েছে এবং স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া স্থানান্তর সম্ভব নয়।
ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ঘটনা নতুন নয়। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে যায়নি। ২০০৩ সালে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড নিরাপত্তার কারণে ম্যাচ বর্জন করেছিল।
সেসব ক্ষেত্রে আইসিসি প্রতিপক্ষ দলকে ওয়াকওভার দিয়েছিল। আবার ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ে সরে দাঁড়ানোয় স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলে, তাহলে সেটি হবে ইতিহাসের এক বড় সিদ্ধান্ত। এর প্রভাব পড়বে বোর্ডের অর্থনীতিতে, ক্রিকেটারদের জীবিকায়, এমনকি বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কাঠামোতেও।
এটি শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পথচলার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এখন দেখার বিষয়, শেষ মুহূর্তে কোনো সমাধান আসে কি না, নাকি বাংলাদেশকে সত্যিই এই বড় মঞ্চের বাইরে থাকতে হয়।


