নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতার প্যারোল নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যশোর জেলায় যে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাল যশোর জেলা প্রশাসন। স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ দেখার জন্য ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির কোনো আবেদনই করা হয়নি বলে জানিয়েছে প্রশাসন। পরিবারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলগেটেই মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে জানানো হয়েছে।
রোববার, ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। বিজ্ঞপ্তিটি পাঠান কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার আশীষ কুমার দাস। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়, প্যারোল সংক্রান্ত বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য ছড়িয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম বর্তমানে কারাবন্দি। তিনি গত ১৫ ডিসেম্বর বাগেরহাট কারাগার থেকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরিত হন। তার স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে প্যারোলে মুক্তির কোনো লিখিত আবেদন করা হয়নি।
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, আবেদন না থাকায় প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ফলে “আবেদন করা হয়েছিল কিন্তু মুক্তি দেওয়া হয়নি” — এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পরিবারের বক্তব্য থেকেই জানা গেছে, সময়ের স্বল্পতার কারণে পরিবারের সদস্যরা প্যারোলে মুক্তির আবেদন না করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা মনে করেন, আবেদন প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে। সেই কারণে পারিবারিক সিদ্ধান্তে জেলগেটেই মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা হয়।
এই সিদ্ধান্তটি ছিল পুরোপুরি পরিবারের নিজস্ব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এতে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি বলেও জানানো হয়।
যশোর জেলা প্রশাসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্ট নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফেসবুকে যেসব পোস্টে বন্দির স্ত্রীকে লেখা চিঠি কিংবা কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছবি দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
এছাড়া “আবেদন করার পরেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি” — এমন দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উল্লেখ করা হয়। কারণ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর বরাবর প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত কোনো আবেদনই জমা পড়েনি।
যদিও লিখিত আবেদন করা হয়নি, তবুও পরিবারের মৌখিক অনুরোধের ভিত্তিতে কারা কর্তৃপক্ষ মানবিক দিক বিবেচনা করে উদ্যোগ নেয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে জেল ফটকে মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ মানবিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি যতটা সম্ভব সংবেদনশীলতার সঙ্গে সামাল দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় বিভ্রান্তি ছড়ানোয় যশোর জেলা প্রশাসন গণমাধ্যমের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রকৃত তথ্য যাচাই করে সত্যনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
জানা গেছে, প্রায় পাঁচ বছর আগে ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের সঙ্গে স্বর্ণালীর বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি সন্তান হয়, যার বয়স ছিল মাত্র নয় মাস। সন্তানটির নাম নাজিম।
সম্প্রতি রাজনৈতিক মামলায় স্বামীর গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি অবস্থাকে কেন্দ্র করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন স্বর্ণালী। স্বামীকে মুক্ত করতে তিনি নানা জায়গায় যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন বলে পরিবারের সূত্রে জানা যায়।
গত শুক্রবার একটি মর্মান্তিক ঘটনা সামনে আসে। ঘরের ভেতর থেকে স্বর্ণালী ও তার নয় মাসের সন্তান নাজিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানা আলোচনা ও অভিযোগ।
এই প্রেক্ষাপটেই প্যারোল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। প্রশাসনের সর্বশেষ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, প্যারোল সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্য যাচাই কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানবিক দিক জড়িয়ে থাকলে ভুল তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
যশোর জেলা প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্যারোল সংক্রান্ত কোনো আবেদন না থাকলে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে না।


