বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা ঘটেছে। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। ২০২৫ সালে স্বর্ণের দামে যে ঐতিহাসিক উত্থান দেখা গিয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় নতুন বছরেও এই মূল্যবান ধাতু বিনিয়োগকারীদের আস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে স্বর্ণের দাম ৬০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তারই প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম ও স্থানীয় বাজারের চিত্র
বাংলাদেশে স্বর্ণ কেনাবেচা হয় ভরি হিসেবে। আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব সরাসরি পড়েছে দেশীয় বাজারেও। বর্তমানে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি প্রায় দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৯১ টাকা। স্থানীয় হিসাবে ২.৪৩ ভরি স্বর্ণ সমান এক আউন্স। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্সে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের স্বর্ণ বাজারেও নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। বিয়ের মৌসুম কিংবা উৎসবের সময় সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকলেও উচ্চমূল্যের কারণে অনেকেই এখন কেনাকাটায় সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও স্বর্ণের উত্থান
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির পেছনে বড় একটি কারণ হলো বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলা ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও নেটোর মধ্যে চলমান টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক বাজারকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ, যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন।
ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ও বাজারে অস্থিরতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী বাণিজ্যনীতি স্বর্ণবাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। সম্প্রতি তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, কানাডা যদি চীনের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তিতে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। এমন বক্তব্য বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ও বন্ডের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাত এড়িয়ে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন।
নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ ও রুপার চাহিদা
অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণকে ঐতিহ্যগতভাবেই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। এর প্রভাব শুধু স্বর্ণেই নয়, রুপার বাজারেও পড়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স রুপার দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত বছর বিশ্ববাজারে রুপার দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছিল। স্বর্ণ ও রুপা দুটিই এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল ডলার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা
স্বর্ণের দামে উত্থানের পেছনে আরও কয়েকটি অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে। বিশ্বজুড়ে তুলনামূলক উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে মার্কিন ডলারের মান দুর্বল হওয়ায় স্বর্ণের চাহিদা বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনে তাদের রিজার্ভ শক্তিশালী করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ চলতি বছরে সুদের হার কমাতে পারে—এমন ধারণাও স্বর্ণের বাজারকে আরও চাঙা করেছে।
যুদ্ধ ও রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রভাব
ইউক্রেন ও গাজায় চলমান সংঘাতের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনাই বিনিয়োগকারীদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা যত বাড়ে, স্বর্ণের চাহিদাও তত বাড়ে—এই পুরনো সমীকরণ আবারও প্রমাণিত হচ্ছে।
স্বর্ণের সীমিত প্রাপ্যতা ও ভবিষ্যৎ সরবরাহ
স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহের অন্যতম বড় কারণ হলো এর সীমিত প্রাপ্যতা। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত পৃথিবীতে মোট প্রায় দুই লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ দিয়েও মাত্র তিন থেকে চারটি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুল ভরা সম্ভব। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই স্বর্ণের বেশিরভাগই উত্তোলন করা হয়েছে ১৯৫০ সালের পর, যখন খনন প্রযুক্তির উন্নতি ঘটে এবং নতুন খনি আবিষ্কৃত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, ভূগর্ভে এখনও প্রায় ৬৪ হাজার টন স্বর্ণ মজুত রয়েছে, যা ভবিষ্যতে উত্তোলন করা সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী বছরগুলোতে স্বর্ণের সরবরাহ ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে, যা দামকে আরও ওপরে ঠেলে দিতে পারে।
ঋণমুক্ত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ
স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান এবিসি রিফাইনারির গ্লোবাল হেড নিকোলাস ফ্রাপেল মনে করেন, স্বর্ণের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি ঋণমুক্ত সম্পদ। বন্ডের মতো এখানে কোনো ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি নেই, আবার শেয়ারের মতো কোনো কোম্পানির পারফরম্যান্সের ওপরও দাম নির্ভর করে না। হাতে স্বর্ণ থাকা মানে অর্থনৈতিক ঝুঁকির একটি বড় অংশ থেকে মুক্ত থাকা।
২০২৫: স্বর্ণের রেকর্ড গড়া বছর
২০২৫ সাল স্বর্ণের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় বছর হয়ে থাকবে। ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম স্বর্ণের দামে সবচেয়ে বড় বার্ষিক উত্থান দেখা গেছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট শেয়ারের অতিমূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে আর্থিক বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এর সরাসরি সুফল পায় স্বর্ণ।
আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মেটালস ফোকাসের গবেষক নিকোস কাভলিসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তাই এই উত্থানের মূল চালিকাশক্তি।
সুদের হার কমার আশঙ্কা ও বিনিয়োগ প্রবণতা
অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা বাড়লে স্বর্ণের দাম বাড়ে—এটি পরিচিত বাস্তবতা। পাশাপাশি সুদের হার কমার আশঙ্কাও স্বর্ণের দাম বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে। সুদের হার কমলে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ কম লাভজনক হয়ে পড়ে। তখন বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ ও রুপার মতো বিকল্প সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছর ফেডারেল রিজার্ভ দুই দফা সুদের হার কমাতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার হিড়িক
শুধু ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরাই নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ব্যাপকভাবে স্বর্ণ কিনছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক শত শত টন স্বর্ণ তাদের রিজার্ভে যোগ করেছে। এতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ডলারনির্ভরতা কমিয়ে স্বর্ণের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বাড়ছে।
স্বর্ণের দাম কমার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না
তবে সব বিশ্লেষকই যে অতিমাত্রায় আশাবাদী, তা নয়। নিকোলাস ফ্রাপেল সতর্ক করে বলেছেন, স্বর্ণের বাজার অনেকটাই খবরনির্ভর। হঠাৎ কোনো ইতিবাচক বৈশ্বিক খবর এলে স্বর্ণের দাম কমতেও পারে। তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সচেতন থাকা জরুরি।
বিনিয়োগ ছাড়াও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
স্বর্ণ শুধু বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, বহু সংস্কৃতিতে এর সামাজিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে বিয়ে ও উৎসবে স্বর্ণ উপহার দেওয়ার প্রচলন আছে। ভারতে দীপাবলি উৎসবকে স্বর্ণ কেনার জন্য শুভ সময় ধরা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়ে স্বর্ণ কিনলে সৌভাগ্য আসে।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মর্গ্যান স্ট্যানলির হিসাবে, ভারতের পরিবারগুলোর হাতে থাকা স্বর্ণের মূল্য প্রায় ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৮৮.৮ শতাংশের সমান। চীনও স্বর্ণের অন্যতম বড় ভোক্তা বাজার, যেখানে চীনা নববর্ষের সময় স্বর্ণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। আসন্ন ‘ইয়ার অব হর্স’ উপলক্ষেও এমন প্রবণতা স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বর্ণের দাম পাঁচ হাজার ডলার ছাড়ানো শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বের অনিশ্চয়তা, আস্থাহীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন।


