যুক্তরাজ্যে প্রযুক্তি খাতে বড় একটি পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। দেশটির প্রতিযোগিতা ও বাজার কর্তৃপক্ষ (CMA) অ্যাপল ও গুগলের কাছ থেকে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে অ্যাপ স্টোর ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।
বিষয়টি শুনতে একটু টেকনিক্যাল লাগলেও এর প্রভাব পড়বে ডেভেলপার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপরও।
এই সিদ্ধান্ত মূলত এমন সময় এসেছে, যখন ইউরোপে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি চলছে। যুক্তরাজ্য যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, তবুও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে তারা ধীরে ধীরে একই ধরনের পথ অনুসরণ করছে। ফলে অ্যাপল ও গুগলের মতো বড় কোম্পানিগুলোকে এখন নতুন কিছু নিয়ম মানতে হবে।
গত কয়েক বছরে ইউরোপে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন এসব কোম্পানিকে “গেটকিপার” হিসেবে চিহ্নিত করেছে, অর্থাৎ তারা ডিজিটাল বাজারে এতটাই শক্তিশালী যে চাইলে প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের CMA-ও একই ধরনের চিন্তা থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরে অ্যাপল ও গুগলকে “কৌশলগত বাজারের অবস্থা” (Strategic Market Status) হিসেবে ঘোষণা করে। সহজ ভাষায় বললে, এই দুই কোম্পানির অ্যাপ স্টোর এতটাই প্রভাবশালী যে তাদের কার্যক্রম পুরো বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়ে।
এই ঘোষণার পর থেকেই CMA দ্রুত কাজ শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল অ্যাপ স্টোরের নিয়মগুলোকে আরও ন্যায্য করা, যাতে ছোট-বড় সব ডেভেলপার সমান সুযোগ পায়।
CMA বলেছে, অ্যাপল ও গুগল এখন থেকে অ্যাপগুলোকে ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করবে। আগে অনেক সময় অভিযোগ ছিল যে বড় কোম্পানির নিজের অ্যাপগুলোকে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়। এখন সেই জায়গায় বদল আনার কথা বলা হয়েছে।
অ্যাপ স্টোরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, অ্যাপ পর্যালোচনার নিয়ম, অ্যাপের র্যাঙ্কিং কীভাবে ঠিক হয়, ডেভেলপারদের ডেটা কীভাবে ব্যবহার করা হয় এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিতে অ্যাক্সেস দেওয়ার বিষয়গুলো।
এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য একটাই—যেন প্রতিযোগিতা ঠিকভাবে চলে এবং নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করা ছোট ডেভেলপাররা পিছিয়ে না পড়ে।
অ্যাপ পর্যালোচনা বা অ্যাপ রিভিউ প্রক্রিয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধাপ পার হলেই একটি অ্যাপ স্টোরে জায়গা পায়। CMA বলেছে, অ্যাপল ও গুগল তাদের নিজের অ্যাপকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারবে না। একইভাবে প্রতিযোগী অ্যাপগুলোর সঙ্গে বৈষম্যও করা যাবে না।
ধরুন, একটি ছোট কোম্পানি নতুন মিউজিক অ্যাপ বানাল। আর একই সময় বড় কোনো কোম্পানির নিজের অ্যাপও আছে। আগে অভিযোগ ছিল, ছোট অ্যাপটি হয়তো অযথা আটকে দেওয়া হতো। এখন এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নিয়ম আরও স্পষ্ট করা হচ্ছে।
অ্যাপ স্টোরে কোন অ্যাপ সামনে থাকবে আর কোনটা নিচে থাকবে, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। CMA বলেছে, এই র্যাঙ্কিং নির্ধারণের সময় নিজেদের অ্যাপকে আলাদা সুবিধা দেওয়া যাবে না। সব অ্যাপকে একই নিয়মে বিচার করতে হবে।
এছাড়া ডেভেলপারদের তথ্য নিয়েও নতুন করে ভাবা হচ্ছে। অ্যাপ তৈরি করতে গিয়ে যে তথ্যগুলো কোম্পানিগুলো সংগ্রহ করে, সেগুলো সুরক্ষিত রাখতে হবে। সেই তথ্য ব্যবহার করে প্রতিযোগী অ্যাপের বিরুদ্ধে অন্যায্য সুবিধা নেওয়া যাবে না।
একটি বড় পরিবর্তন হতে পারে প্রযুক্তিতে অ্যাক্সেসের ক্ষেত্রে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক এনএফসি প্রযুক্তি, যেটা দিয়ে ফোন ছুঁইয়ে পেমেন্ট করা যায়। আগে এই ধরনের ফিচারে সব ডেভেলপার সমানভাবে প্রবেশাধিকার পেত না।
এখন ডেভেলপাররা চাইলে এসব ফিচারে অ্যাক্সেস চাওয়ার সুযোগ পাবে। যেমন, ডিজিটাল ওয়ালেট বা পেমেন্ট অ্যাপ তৈরির ক্ষেত্রে এটি বেশ কাজে লাগতে পারে। যদিও অ্যাপল বা গুগলকে সরাসরি অনুমতি দিতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও তারা প্রতিটি অনুরোধ ন্যায্যভাবে বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছে।
এর আগেও ইউরোপের কিছু দেশে এই সুবিধা ব্যবহার করে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন অ্যাপ ও সেবা আসতে পারে।
শুধু প্রতিশ্রুতি নিলেই তো হবে না, সেগুলো ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না, সেটাও দেখা দরকার। CMA জানিয়েছে, তারা অ্যাপল ও গুগলের ওপর নিয়মিত নজর রাখবে।
এই দুই কোম্পানিকে কিছু নির্দিষ্ট তথ্য নিয়মিত দিতে হবে। যেমন, কতগুলো অ্যাপ অনুমোদিত হলো, কতগুলো বাতিল হলো, কতগুলো আপিল করা হলো। একটি অ্যাপ রিভিউ করতে কত সময় লাগছে, কতগুলো অভিযোগ আসছে, এসব তথ্যও দিতে হবে।
এছাড়া প্রযুক্তিতে অ্যাক্সেস চেয়ে কতগুলো আবেদন আসছে, সেগুলোর ফলাফল কী—এসব বিষয়ও পর্যবেক্ষণ করা হবে। পরে এই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হতে পারে।
গুগল বলেছে, তাদের বর্তমান নীতিগুলো ইতিমধ্যেই অনেকটা এই নিয়মের সঙ্গে মিলে যায়। তবুও CMA-এর এই উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানিয়েছে।
অ্যাপলও একইভাবে জানিয়েছে, এই প্রতিশ্রুতিগুলো তাদের ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রেখে নতুন উদ্ভাবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি ডেভেলপারদের জন্য আরও ভালো সুযোগ তৈরি হবে।
অ্যাপল আরও বলেছে, তারা প্রতিটি বাজারেই কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয় এবং সব সময় সেরা পণ্য ও অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করে।
সাধারণ ব্যবহারকারীরা হয়তো খুব বড় কোনো পরিবর্তন তৎক্ষণাৎ টের পাবেন না। কারণ অ্যাপ ডাউনলোড করা, ব্যবহার করা বা আপডেট নেওয়ার প্রক্রিয়া আগের মতোই থাকবে।
তবে ভেতরের দিক থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে পারে। যদি ডেভেলপাররা আরও বেশি সুযোগ পায়, তাহলে নতুন নতুন অ্যাপ, নতুন ফিচার এবং ভালো সেবা আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সেটাই ব্যবহারকারীদের জন্য লাভজনক হবে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে অ্যাপ ডেভেলপারদের ওপর। আগে যেসব জায়গায় সীমাবদ্ধতা ছিল, এখন সেখানে নতুন দরজা খুলতে পারে।
বিশেষ করে পেমেন্ট সিস্টেম, ডিজিটাল ওয়ালেট, বা নতুন ধরনের সেবার ক্ষেত্রে আরও বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হবে। নতুন কোম্পানি বা স্টার্টআপগুলোও বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারবে।
এখনও এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। CMA জানিয়েছে, তারা এই প্রস্তাব নিয়ে সবার মতামত জানতে চায়। ৩ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এরপর সব কিছু ঠিক থাকলে ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবে দেখতে হয়তো খুব বেশি সময় লাগবে না।
এর আগেও CMA অভিযোগ করেছিল যে অ্যাপল আইফোনে ব্রাউজারের প্রতিযোগিতা কিছুটা সীমিত করে রাখে। যদিও তখন কোনো কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, এবার তারা আরও সক্রিয়ভাবে বিষয়গুলো দেখছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাজ্যে অ্যাপ স্টোর ব্যবস্থায় বড় একটি পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। এটি হয়তো একদিনে সব কিছু বদলে দেবে না, কিন্তু ধীরে ধীরে প্রযুক্তি বাজারকে আরও উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছাবে সাধারণ ব্যবহারকারীর হাতের ফোনেও।


