ভ্যালেন্টাইনস ডে মানেই ভালোবাসার দিন। লাল গোলাপ, চকলেট, আর মনের মানুষের জন্য ছোট্ট কোনও চমক—এই ছবিটাই আমাদের মাথায় আগে ভেসে ওঠে। কিন্তু সময় বদলেছে। ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে অভিমান, রাগ আর ভাঙা সম্পর্কের কষ্টও এই দিনটাকে ঘিরে থাকে।
আর সেই কষ্ট থেকেই জন্ম নিচ্ছে এক অদ্ভুত ট্রেন্ড। কয়েকটি বড় শহরে ভ্যালেন্টাইনস ডে যত এগিয়ে আসছে, ততই বেড়ালের মল, আরশোলা, ইঁদুর আর নানারকম বিশ্রী দেখতে পোকার চাহিদা বাড়ছে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, মানুষ এখন এসব জিনিস কিনতে টাকা খরচ করছে।
সাধারণত মানুষ এসব জিনিস থেকে দূরে থাকতে চায়। কেউই তো নিজের ঘরে আরশোলা দেখতে পছন্দ করে না, আর ইঁদুরের নাম শুনলেই বিরক্তি লাগে। বেড়ালের মল বা অদ্ভুত পোকা—এসব নিয়ে কারও কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয়। কিন্তু ভালোবাসার উৎসব যত কাছাকাছি আসছে, ততই এই জিনিসগুলোর চাহিদা অদ্ভুতভাবে বাড়ছে।
এর পেছনে কাজ করছে এক নতুন ভাবনা। অনেকেই এই দিনটাকে শুধু ভালোবাসা প্রকাশের দিন হিসেবে দেখেন না। কারও কাছে এটা পুরনো সম্পর্কের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, কারও কাছে আবার ভাঙা হৃদয়ের ব্যথা। সেই আবেগ থেকেই কেউ কেউ অভিনব উপায়ে নিজেদের রাগ বা কষ্ট প্রকাশ করতে চাইছেন।
সম্পর্ক গড়ে ওঠে, আবার অনেক সময় ভেঙেও যায়। এখনকার সময়ে ব্রেকআপ খুব সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু মনের ভেতরের কষ্ট বা অভিমান সহজে যায় না। অনেকের মনে হয়, তাঁকে যিনি কষ্ট দিয়েছেন, তিনি যেন বুঝতে পারেন সেই যন্ত্রণার কথা।
এই ভাবনা থেকেই ভ্যালেন্টাইনস ডে-কে ঘিরে শুরু হয়েছে এক অন্যরকম প্রবণতা। কিছু মানুষ তাঁদের প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকার নাম দিয়ে আরশোলা বা ইঁদুরের নামকরণ করছেন। কেউ কেউ আবার বেড়ালের মল কিনে তা একটি উপহারের বাক্সে ভরে পাঠাচ্ছেন। যেন প্রতীকীভাবে জানিয়ে দেওয়া—তাঁর কাছে সেই সম্পর্কের মূল্য কতটা কমে গেছে।
এটা নিছক মজা নয়। অনেকের কাছে এটা এক ধরনের মানসিক মুক্তি। কেউ হয়তো সরাসরি কিছু বলতে পারেন না, কিন্তু এই অদ্ভুত উপহারের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে চান।
মানুষের এই চাহিদা দেখে কিছু সংস্থা এবং চিড়িয়াখানা বিষয়টাকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে। তারা বিভিন্ন প্যাকেজ তৈরি করেছে, যেখানে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে আপনি একটি আরশোলা বা ইঁদুরের নাম আপনার পছন্দের কারও নামে রাখতে পারেন।
অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, শুধু নামকরণই নয়, তার সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে একটি সার্টিফিকেটও। সেখানে লেখা থাকে যে এই নির্দিষ্ট প্রাণীটির নাম আপনার দেওয়া নামেই রাখা হয়েছে। কেউ কেউ এই সার্টিফিকেট প্রিন্ট করে ফ্রেমে বাঁধিয়ে পাঠাচ্ছেন, আবার কেউ উপহারের বাক্সে করে পাঠাচ্ছেন।
এভাবে একটি অদ্ভুত জিনিসও ব্যবসার নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ভালোবাসার দিনের আগেই এইসব প্যাকেজের চাহিদা বাড়তে থাকে।
এই ট্রেন্ড শুধু কথার কথা নয়। এর পেছনে বেশ মোটা টাকাও খরচ হচ্ছে। একটি আরশোলার নাম কারও নামে রাখতে প্রায় ১৫ ডলার খরচ করতে হয়। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকার মতো। যদি তার সঙ্গে উপহারের বাক্স, কিছু সম্পর্কিত জিনিসপত্র আর একটি সার্টিফিকেট যোগ করা হয়, তাহলে সেই খরচ প্রায় ৭০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার টাকার কাছাকাছি।
রাস্তার ইঁদুরের ক্ষেত্রেও একইরকম ব্যবস্থা রয়েছে। ইঁদুরের নাম কারও নামে রাখতে খরচ হয় প্রায় ১৫ ডলার। অনেকেই এই খরচ করতে রাজি হচ্ছেন, শুধু নিজের মনের রাগ বা অভিমান প্রকাশ করার জন্য।
এই অদ্ভুত প্রবণতার শুরু হয়েছে নিউ ইয়র্কে। প্রথমে এটা অনেকের কাছে মজার মনে হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বিষয়টি ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। এখন শুধু নিউ ইয়র্কেই নয়, আরও কিছু বড় শহরেও এই ধরণের অফার দেখা যাচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। কেউ এটাকে মজার বলে মনে করছেন, কেউ আবার বলছেন এটা ভাঙা সম্পর্কের কষ্টের এক নতুন প্রকাশ।
ভ্যালেন্টাইনস ডে শুধু প্রেমের দিন নয়। অনেকের কাছে এটা স্মৃতির দিন। কেউ এই দিনে নতুন সম্পর্ক শুরু করেন, আবার কেউ পুরনো সম্পর্কের কথা মনে করে মন খারাপ করেন। সেই অনুভূতি থেকেই এই অদ্ভুত উপহারগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
একজন মানুষ যখন খুব কষ্ট পায়, তখন সে নানা ভাবে সেই কষ্ট প্রকাশ করতে চায়। কেউ গান শোনেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান, আবার কেউ এই ধরনের মজার কিন্তু কটু ইঙ্গিতপূর্ণ উপহার পাঠান।
অনেকেই বলছেন, এই ট্রেন্ডের মধ্যে এক ধরনের হাস্যরস আছে। কেউ সরাসরি কিছু না বলে এমনভাবে নিজের মনের কথা জানাচ্ছেন, যা দেখে অন্যরাও মজা পাচ্ছেন। আবার কেউ মনে করছেন, এতে পুরনো সম্পর্কের তিক্ততা আরও বাড়ে।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—মানুষ এখন নিজের অনুভূতি প্রকাশের নতুন নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে। আগে যেখানে শুধু ফুল বা কার্ড ছিল, এখন সেখানে অদ্ভুত জিনিসও জায়গা করে নিচ্ছে।
ভ্যালেন্টাইনস ডে মানেই শুধু ভালোবাসা নয়, মানুষের আবেগের এক মিশ্র ছবি। কেউ আনন্দে ভাসেন, কেউ আবার পুরনো কষ্ট ভুলতে চান। এই অদ্ভুত উপহারের ট্রেন্ড সেই আবেগেরই এক অন্যরকম প্রকাশ।
হয়তো কারও কাছে এটা হাসির বিষয়, কারও কাছে আবার মানসিক চাপ কমানোর একটা উপায়। কিন্তু এটা বলাই যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসা প্রকাশের ধরন বদলাচ্ছে। আর সেই বদলের মধ্যেই কখনও কখনও এমন অদ্ভুত, অচেনা ট্রেন্ড জন্ম নেয়, যা শুনলে প্রথমে অবাক লাগে, পরে ভাবতে হয়—মানুষ আসলে কত রকমভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।


