বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন চলছে ভোট গণনা। কিন্তু ভোটের দিন শেষ হওয়ার আগেই বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ভোটার উপস্থিতি কি প্রত্যাশার তুলনায় কম?
বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে ভোটের হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। দলটি মনে করছে, ভোটারদের কম অংশগ্রহণ তাদের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ভোটের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে এমন অভিযোগ ওঠে যে ভোটারদের ভিড় তেমন চোখে পড়ছে না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই আলোচনা আরও জোরালো হয়। বিএনপি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি আশানুরূপ নয়।
দলটির বক্তব্য স্পষ্ট—যত বেশি মানুষ ভোট দেবে, ততই তাদের ভোট বাড়বে। তাই নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, ভোটারদের আরও বেশি করে কেন্দ্রমুখী করতে হবে। মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তুমি যদি সহজভাবে ভাবো, বিষয়টা এমন—ধরো কোনো খেলায় তোমার সমর্থকেরা মাঠে এলই না, তাহলে তো তোমার জেতা কঠিন হয়ে যায়। ঠিক তেমনই ভোটেও সমর্থকের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সকালে ঢাকার গুলশানের একটি কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান। ভোট দেওয়ার পর থেকেই দলের ভেতরে ভোটের হার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
দুপুরের পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দলটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, দেশের সার্বিক ভোটার উপস্থিতি কম। বিশেষ করে তিনটি বিভাগ—ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট—নিয়ে আলাদা উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১১টা পর্যন্ত সাড়ে তিন ঘণ্টায় ভোট পড়েছে ১৪.৯৬ শতাংশ। এরপর মাত্র এক ঘণ্টায় ভোটের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩২.৮৮ শতাংশে। এই হঠাৎ বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণত সকালেই ভোটারদের উপস্থিতি বেশি থাকে। দুপুরের পর ভোটকেন্দ্রে ভিড় কমে আসে। তাই দুপুরের আগে তুলনামূলক কম হার এবং পরের এক ঘণ্টায় হঠাৎ বেশি হার—এটা অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
আওয়ামী লীগের এক নেতা মন্তব্য করেছেন, এই পরিসংখ্যান নিয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদিও দলটি এবার নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তবুও ভোটের হার নিয়ে তাদের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ফলে রাজনৈতিক ময়দানে সমীকরণ বদলে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। এই প্রেক্ষাপটে ভোটারদের অংশগ্রহণ কতটা হবে—সেটা নিয়েই আগ্রহ ছিল সবার। কিন্তু বাস্তবে অনেক কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম দেখা যাওয়ায় আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হয়েছে।
ফলে ভোটারদের দুটি ব্যালটে ভোট দিতে হয়েছে। গণনা প্রক্রিয়াও তাই তুলনামূলক জটিল। দুটি ব্যালট একসঙ্গে গণনা করতে হওয়ায় ফলাফল প্রকাশে সময় বেশি লাগতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
অনেকে মনে করছেন, আনুষ্ঠানিক ফলাফল জানতে শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই গণনা শুরু হয়েছে। কিন্তু দুটি আলাদা ব্যালট গোনা মানে দ্বিগুণ কাজ। স্বাভাবিকভাবেই সময় বেশি লাগছে।
ভাবো তো, একটি খাতা যাচাই করতে যেমন সময় লাগে, দুটি খাতা হলে সময় আরও বাড়বে। ঠিক তেমনই এখানে কাজের পরিমাণ বেড়েছে। তাই ফলাফল জানতে একটু ধৈর্য ধরতেই হবে।
ভোটকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত অশান্তির খবরও পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যদিও বড় ধরনের সহিংসতার খবর নেই, তবুও বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে পরিবেশ পুরোপুরি শান্ত ছিল না।
নির্বাচনের দিন এমন পরিস্থিতি ভোটারদের মানসিকতাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকেই অশান্তির আশঙ্কায় কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন—এমন ধারণাও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে।
ভোটের হার শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটি আসলে মানুষের আগ্রহ, আস্থা ও অংশগ্রহণের প্রতিফলন। বেশি ভোট মানে মানুষ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে। কম ভোট মানে হয়তো উদাসীনতা, হয়তো হতাশা, আবার হয়তো অন্য কোনো কারণ।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ভোটের হার একটি বড় সূচক। কারণ তাদের সমর্থকেরা কেন্দ্রে না গেলে ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে। তাই বিএনপি যেমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তেমনি অন্য পক্ষও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এখন সবার নজর গণনার ফলাফলের দিকে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এবারের নির্বাচন নানা দিক থেকে ব্যতিক্রমী।
একদিকে বড় একটি দল নির্বাচনের বাইরে, অন্যদিকে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে, তার ওপর ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত ফলাফল যা-ই হোক, গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের অংশগ্রহণ। কারণ ভোট শুধু একটি দায়িত্ব নয়, এটি নিজের মত প্রকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়। এখন দেখার বিষয়, চূড়ান্ত ফল কী বার্তা দেয় দেশের রাজনীতিকে।


