আইপিএল শুরুর আগেই মহেন্দ্র সিং ধোনির সামনে এলো এক অপ্রত্যাশিত আইনি নির্দেশ। মানহানি সংক্রান্ত একটি পুরনো মামলার প্রেক্ষিতে মাদ্রাজ হাই কোর্ট তাঁকে ১০ লক্ষ টাকা জমা দিতে বলেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এক মাসের মধ্যে এই অর্থ প্রধান বিচারপতির ত্রাণ তহবিলে জমা করতে হবে।
শুনতে অনেকের কাছে বিষয়টি বড় শাস্তি মনে হলেও, আসলে এটি কোনও জরিমানা নয়। মামলার প্রক্রিয়াগত খরচ মেটানোর জন্যই আদালত এই নির্দেশ দিয়েছে। তবু আইপিএলের প্রস্তুতির মাঝে এই নির্দেশ স্বাভাবিকভাবেই ধোনির জন্য বড় ধাক্কা।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৩ সালে। সে সময় আইপিএলকে ঘিরে বড়সড় ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগ ওঠে। গোটা ভারতীয় ক্রিকেট মহল কার্যত তোলপাড় হয়ে যায়। তদন্তের দায়িত্ব পান আইপিএস অফিসার জি সম্পথ কুমার। তাঁর প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে চেন্নাই সুপার কিংস ও রাজস্থান রয়্যালসকে নির্বাসনের মুখে পড়তে হয়।
এই তদন্ত প্রতিবেদন পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু পরে সম্পথ কুমার অভিযোগ করেন, তাঁর জমা দেওয়া রিপোর্টের পূর্ণাঙ্গ অংশ প্রকাশ করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, রিপোর্ট সম্পূর্ণ প্রকাশ পেলে ২০১৩ সালের ম্যাচ গড়াপেটায় আরও কিছু বড় নাম সামনে আসত। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে ধোনির নামও উঠে আসে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ক্রিকেট ভক্তদের কাছে বিষয়টি ছিল বিস্ময়কর। কারণ ধোনি বরাবরই “ক্যাপ্টেন কুল” হিসেবে পরিচিত—চাপের মধ্যেও যিনি শান্ত থাকেন। তাই তাঁর নাম এমন বিতর্কে জড়ানো অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল।
এই অভিযোগের পরই ধোনি আইনি লড়াই শুরু করেন। ২০১৪ সালে তিনি সম্পথ কুমারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করেন। ধোনির অভিযোগ ছিল, সম্পথ এমন মন্তব্য করেছেন যা সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
ধোনি আদালতের কাছে আবেদন জানান, ম্যাচ গড়াপেটা প্রসঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে কোনওরকম মন্তব্য করা থেকে সম্পথ যেন বিরত থাকেন। পাশাপাশি তিনি ১০০ কোটি টাকার মানহানির দাবি জানান।
পরে সম্পথ কুমার দোষী সাব্যস্ত হন। যদিও সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সাজা স্থগিত রাখে। অর্থাৎ মামলার প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হয়নি, বরং আইনি লড়াই দীর্ঘায়িত হয়েছে।
এবারের নির্দেশ এসেছে সেই মামলারই ধারাবাহিকতায়। ২০১৩ সালের মামলায় প্রমাণ হিসেবে বেশ কিছু সিডি আদালতে জমা দেওয়া হয়েছিল। এই সিডিগুলোর বক্তব্য আদালতে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে দোভাষী ও টাইপিস্ট নিয়োগের প্রয়োজন হয়েছে।
আদালত জানায়, এই অনুবাদ ও টাইপিংয়ের খরচ বহন করবেন ধোনি। সেই খরচ বাবদই ১০ লক্ষ টাকা জমা দিতে হবে। এটি কোনও দণ্ড বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। বরং মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয়।
ধরো, তুমি কোনও বড় প্রজেক্ট করছো, আর সেখানে কাগজপত্র অনুবাদ বা ডকুমেন্ট প্রস্তুতের খরচ লাগে—সেটা তো কাউকে না কাউকে দিতেই হয়। ঠিক তেমনই এখানে আদালতের কাজ চালাতে এই অর্থ প্রয়োজন হয়েছে।
ধোনি ইতিমধ্যেই আইপিএলের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। বয়স বাড়লেও তাঁর ফিটনেস ও নেতৃত্বগুণ নিয়ে এখনও আলোচনা চলে। ভক্তরা প্রতি মৌসুমেই অপেক্ষা করেন, “মাহি” আবার কী চমক দেখান।
কিন্তু টুর্নামেন্টে নামার আগে এই আইনি নির্দেশ নিঃসন্দেহে তাঁর জন্য অস্বস্তিকর। যদিও এটি সরাসরি খেলায় প্রভাব ফেলবে না, তবুও মানসিকভাবে চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যখন পুরনো বিতর্ক আবার আলোচনায় আসে।
মহেন্দ্র সিং ধোনি শুধু একজন ক্রিকেটার নন, তিনি একটি ব্র্যান্ড। বিশ্বকাপ জয়, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, আইপিএল শিরোপা—সব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার অসাধারণ। তাই যে কোনও আইনি জটিলতা স্বাভাবিকভাবেই খবরের শিরোনামে উঠে আসে।
তবে এই মামলায় আদালতের নির্দেশকে শাস্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। অনেক সময় আদালতে এমন খরচ মামলার পক্ষকেই বহন করতে হয়।
জনমতের দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০১৩ সালের আইপিএল কেলেঙ্কারি এখনও অনেকের মনে প্রশ্ন জাগায়। সেই অধ্যায় পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেই হয়তো মামলার শুনানি এখনও চলছে।
এখন দেখার বিষয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ধোনি অর্থ জমা দেন কি না এবং মামলার পরবর্তী শুনানিতে কী সিদ্ধান্ত আসে। আইনি প্রক্রিয়া নিজের গতিতেই চলবে।
ক্রিকেটের দুনিয়ায় যেমন এক ওভারে খেলার মোড় ঘুরে যায়, তেমনি আদালতের ক্ষেত্রেও একেকটি শুনানি বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আপাতত এই নির্দেশকে বড় শাস্তি না ভেবে মামলার একটি ধাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আইপিএলের আগে মানহানি মামলায় ১০ লক্ষ টাকা জমার নির্দেশ নিঃসন্দেহে ধোনির জন্য বড় খবর। কিন্তু এটি জরিমানা নয়, বরং মামলার প্রমাণপত্র অনুবাদ ও টাইপিংয়ের খরচ।
২০১৩ সালের আইপিএল ম্যাচ গড়াপেটা বিতর্ক, তদন্তকারী অফিসারের মন্তব্য এবং পরবর্তী আইনি লড়াই—সব মিলিয়ে এই মামলার পথ দীর্ঘ।
ভক্তদের জন্য এখন মূল প্রশ্ন একটাই—এই আইনি ঝামেলা কি ধোনির পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলবে? নাকি আগের মতোই শান্ত থেকে তিনি আবারও মাঠে জবাব দেবেন?
ক্রিকেটপ্রেমীরা জানেন, ধোনি চাপে ভেঙে পড়ার মানুষ নন। তাই আইপিএলের মঞ্চে তাঁর ব্যাট আর কৌশলই শেষ কথা বলবে।


