ক্রিকেট মানেই শুধু খেলা নয়, এখন এটি এক বিশাল অর্থনীতির নাম। যেখানে একজন ক্রিকেটার মাঠে ভালো খেললে তার জীবন রাতারাতি বদলে যেতে পারে। কিন্তু সব লিগের চিত্র এক নয়। কোথাও অর্থের বন্যা, আবার কোথাও সংগ্রাম করে রোজগার করতে হয়। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ আর পাকিস্তান সুপার লিগ– এই দুই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের তুলনা করলে পার্থক্যটা চোখে পড়ে আরও স্পষ্টভাবে।
একটা ছোট উদাহরণ ভাবুন। একই খেলায় দুজন মানুষ খেলছে, একজন একই পারফরম্যান্সে কোটি কোটি টাকা পাচ্ছে, আর অন্যজন তার অর্ধেকও পাচ্ছে না। ঠিক এমনটাই হচ্ছে এই দুই লিগে।
এই বছর সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছেন তরুণ অলরাউন্ডার প্রশান্ত বীর। তাকে কিনেছে চেন্নাই সুপার কিংস। তার বেস প্রাইস ছিল মাত্র ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু নিলামে তিনি বিক্রি হন ১৪.২০ কোটি টাকায়। একেবারে ইতিহাস গড়ে ফেলেছেন তিনি। কারণ এত বড় অঙ্কে এর আগে কোনো আনক্যাপড ক্রিকেটার বিক্রি হননি।
এই ঘটনা দেখলে মনে হয়, আইপিএল যেন নতুন ক্রিকেটারদের জন্য এক স্বপ্নের দরজা। এখানে শুধু আন্তর্জাতিক তারকারাই নয়, নতুন মুখও রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়।
অন্যদিকে পিএসএলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ার তারকা স্টিভ স্মিথ। আইপিএলে দল না পাওয়ায় তিনি পিএসএলে খেলতে যান। তাকে নিয়েছিল শিয়ালকোট স্ট্যালিওনজ। তিনি পেয়েছেন ১৪ কোটি পাকিস্তানি রুপি, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪.৫ কোটি টাকা।
এখানেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা। আইপিএলের একজন আনক্যাপড ক্রিকেটার যেখানে ১৪ কোটির বেশি পাচ্ছেন, সেখানে পিএসএলের সবচেয়ে বড় তারকার পারিশ্রমিক তার তুলনায় প্রায় ১০ কোটি কম।
২০২৫ সালের দিকে একটু ফিরে তাকালে পার্থক্যটা আরও পরিষ্কার বোঝা যায়। সেই বছর আইপিএলের সবচেয়ে দামি ক্রিকেটার ছিলেন ঋষভ পন্থ। তাকে ২৭ কোটি টাকায় কিনেছিল লখনউ সুপার জায়ান্টস। এই এক খেলোয়াড়ের দামই পিএসএলের একাধিক তারকার মোট বেতনের থেকেও বেশি।
আরেকটা মজার তথ্য আছে। পিএসএলের গত বছরের শীর্ষ ১০ দামি ক্রিকেটারের মোট বেতন মিলিয়েও পন্থের একার বেতনের কাছে দাঁড়াতে পারে না। শুনলে অবাক লাগে, কিন্তু এটাই বাস্তব।
২০২৫ সালের পিএসএলে সবচেয়ে দামি ক্রিকেটার ছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার। তিনি করাচি কিংস–এর হয়ে খেলেছিলেন। তার পারিশ্রমিক ছিল প্রায় ২.৫৭ কোটি টাকা। পন্থের ২৭ কোটির পাশে এই অঙ্কটা সত্যিই খুব ছোট মনে হয়।
এই পার্থক্য শুধু সংখ্যার নয়, এটি দুই লিগের শক্তি আর বাজারমূল্যেরও প্রতিফলন।
২০২৬ সালে এই পার্থক্য আরও বড় হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিনকে ২৫.২০ কোটি টাকায় কিনেছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। এই অঙ্কটা স্টিভ স্মিথের পাওয়া টাকার থেকেও প্রায় ১১ কোটি বেশি।
মানে দাঁড়াল, একই দেশের দুই ক্রিকেটারের মধ্যে এমন পার্থক্য শুধু লিগ বদলানোর কারণে। একজন আইপিএলে খেলছেন, আরেকজন পিএসএলে। আর তাতেই আয়ের ব্যবধান বিশাল হয়ে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পিএসএল তাদের দল সংখ্যা বাড়িয়ে আটে নিয়ে যায়। নতুন দুটি ফ্র্যাঞ্চাইজি হায়দরাবাদ ও শিয়ালকোট বিক্রি হয় যথাক্রমে প্রায় ৬.২৫ মিলিয়ন ও ৬.৬ মিলিয়ন ডলারে। ভারতীয় টাকায় যা প্রায় ৫৬ থেকে ৫৯ কোটি।
এই সংখ্যাগুলো শুনতে বড় লাগতে পারে। কিন্তু আইপিএলের দিকে তাকালে চিত্রটা একেবারেই আলাদা। ২০২১ সালে আরপিএসজি গ্রুপ একটি নতুন আইপিএল দল কিনেছিল ৭,০৯০ কোটি টাকায়। এখানে বোঝাই যায়, দুই লিগের আর্থিক শক্তি কতটা আলাদা।
একটা হিসাব করলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়। ঋষভ পন্থের ২৭ কোটি আর শ্রেয়স আইয়ার–এর ২৬.৭৫ কোটি টাকা, এই দুই খেলোয়াড়ের মোট বেতন মিলিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ কোটি। এই অঙ্ক দিয়ে পিএসএলের একটি নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া যায়।
মানে দাঁড়াল, আইপিএলের দুই তারকার বেতনের সমান টাকায় পাকিস্তানে একটি পেশাদার দল কেনা সম্ভব। ক্রিকেট দুনিয়ায় এমন তুলনা খুব কমই দেখা যায়।
শুধু খেলোয়াড়দের বেতন নয়, পুরস্কারের টাকাতেও বিশাল ফারাক আছে। পিএসএলে গত বছর চ্যাম্পিয়ন দল পেয়েছিল পাকিস্তানি মূল্যে ১৪ কোটি টাকা। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৪.৫ কোটি। রানার্স দল পেয়েছিল ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের আইপিএলে চ্যাম্পিয়ন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু পেয়েছিল ২০ কোটি টাকা। রানার্স দল পেয়েছিল ১২ কোটি। তৃতীয় স্থানে থাকা দল পেয়েছিল ৭ কোটি, আর চতুর্থ স্থানে থাকা দল পেয়েছিল ৬.৫ কোটি।
এখানে একটা মজার ব্যাপার খেয়াল করলে বোঝা যায়। পিএসএলের চ্যাম্পিয়ন দল যে টাকা পায়, আইপিএলের চতুর্থ স্থানে থাকা দলও তার চেয়ে বেশি পায়।
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, এমনটা কেন হচ্ছে? আসলে আইপিএলের বাজার অনেক বড়। এখানে স্পনসর, বিজ্ঞাপন, টিভি রাইটস—সব কিছুতেই প্রচুর টাকা ঢোকে। ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো সহজেই খেলোয়াড়দের জন্য বড় অঙ্ক খরচ করতে পারে।
আর পিএসএল এখনও সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। যদিও লিগটি জনপ্রিয়, কিন্তু আর্থিক দিক থেকে আইপিএলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন।
এই পার্থক্যের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে খেলোয়াড়দের জীবনে। একজন আইপিএলে সুযোগ পেলে তার ক্যারিয়ারই বদলে যেতে পারে। বাড়ি, গাড়ি, নিরাপদ ভবিষ্যৎ—সব কিছু একসঙ্গে পেয়ে যায়।
অন্যদিকে পিএসএলেও ভালো টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু সেই অঙ্ক আইপিএলের মতো বিশাল নয়। তাই অনেক বিদেশি ক্রিকেটার প্রথমে আইপিএলে সুযোগ খোঁজেন, তারপর অন্য লিগে যান।
ক্রিকেট এখন শুধু ব্যাট আর বলের খেলা নয়। এটি এক বিশাল ব্যবসা। যেখানে একটি লিগ পুরো ক্রিকেট অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে। আইপিএল আর পিএসএলের তুলনা করলে সেই বাস্তবতাই সামনে আসে।
একদিকে এমন লিগ, যেখানে একজন নতুন খেলোয়াড়ও কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়। অন্যদিকে এমন লিগ, যেখানে বড় তারকারাও তুলনামূলক কম পারিশ্রমিক পান।
তবুও দুই লিগই নিজেদের জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য থাকে মাঠেই। তবে অর্থের এই পার্থক্য যে ক্রিকেট দুনিয়ায় এক বিরল উদাহরণ তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

