শীতকালীন অলিম্পিক্স মানেই বরফের লড়াই, স্কিইং, আইস হকি, ফিগার স্কেটিং—রোমাঞ্চে ভরা এক বিশ্বমঞ্চ। কিন্তু এবার খেলাধুলার বাইরেও অন্য এক বিষয় নিয়ে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে। বিষয়টি হল অলিম্পিক ভিলেজে কন্ডোমের চাহিদা এবং হঠাৎ তৈরি হওয়া সংকট।
২০২৬ সালের শীতকালীন অলিম্পিক্স বসেছে ইতালির মিলান-কর্টিনায়। অলিম্পিক ভিলেজ তৈরি হয়েছে সুন্দর পাহাড়ি শহর Cortina d’Ampezzo-তে। এখানেই প্রায় ২,৯০০ ক্রীড়াবিদ একসঙ্গে থাকছেন। খেলা শুরুর মাত্র তিন দিনের মধ্যেই প্রায় ১০ হাজার প্যাকেট কন্ডোম শেষ হয়ে যাওয়ায় আয়োজকেরা এখন বেশ চাপে।
অনেকেই জানেন না, অলিম্পিক্সে কন্ডোম বিতরণের নিয়ম আজকের নয়। প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার Seoul Olympics-এ। তখন থেকেই অলিম্পিক ভিলেজে খেলোয়াড়দের জন্য বিনামূল্যে কন্ডোম দেওয়া শুরু হয়।
এর উদ্দেশ্য খুবই সহজ। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা তরুণ-তরুণী ক্রীড়াবিদেরা প্রায় দুই সপ্তাহ একসঙ্গে থাকেন। বন্ধুত্ব হয়, সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাই যদি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, সেটি যেন নিরাপদ হয়—এই ভাবনা থেকেই কন্ডোম বিতরণের প্রচলন।
এরপর টানা একাধিক গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্সে এই নিয়ম বজায় থাকে। এমনকি অনেক বছর ধরে মাথাপিছু হিসেব করেও কন্ডোম সরবরাহ করা হয়েছে।
২০২০ সালের অলিম্পিক্সে প্রথম বড় ব্যতিক্রম দেখা যায়। কোভিড মহামারির কারণে খেলোয়াড়দের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ঘনিষ্ঠতা এবং সামাজিক মেলামেশায় কড়াকড়ি ছিল। ফলে কন্ডোম বিতরণ থাকলেও তার ব্যবহার নিয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়।
কিন্তু ২০২৪ সালের Paris Olympics-এ আবার আগের নিয়মে ফেরা হয়। তখন আয়োজকেরা প্রায় ১০,৫০০ ক্রীড়াবিদের জন্য দু’লক্ষেরও বেশি কন্ডোম সরবরাহ করেছিলেন। আগের কয়েকটি গেমসে সেই সংখ্যা তিন লক্ষও ছাড়িয়েছিল। অর্থাৎ চাহিদা নিয়ে আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা ছিল।
এবারের ঘটনাটা একটু অন্যরকম। আয়োজকেরা শুরুতে প্রায় ১০ হাজার প্যাকেট কন্ডোম মজুত রেখেছিলেন। প্রায় ২,৯০০ ক্রীড়াবিদের জন্য এই পরিমাণ যথেষ্ট হবে বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, মাত্র তিন দিনের মধ্যেই সেই মজুত ফুরিয়ে গেল।
ইতালীয় সংবাদমাধ্যম ‘লা স্ট্যাম্পা’-কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্রীড়াবিদ জানিয়েছেন, “খেলা শুরুর তিন দিনের মধ্যেই সব শেষ। নতুন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি মিলেছে, কিন্তু কবে আসবে তা কেউ জানে না।”
শুনে অবাক লাগতেই পারে। কিন্তু ভাবুন তো, এতজন তরুণ ক্রীড়াবিদ একসঙ্গে থাকছেন। প্রতিদিন অনুশীলন, প্রতিযোগিতা, উত্তেজনা—তার মাঝে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফলে চাহিদা বাড়বে, সেটাই তো স্বাভাবিক।
সূত্রের দাবি, আয়োজকেরা হয়তো আগের গেমসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী যথেষ্ট সরবরাহ রাখেননি। যেখানে প্যারিসে মাথাপিছু প্রতিদিন দু’টি কন্ডোমের হিসেব ধরা হয়েছিল, সেখানে এবার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। পুরো মজুতই ১০ হাজারের কম।
অলিম্পিক্স কর্মকর্তারাও ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। তারা জানিয়েছেন, বাকি দিনগুলোর জন্য অতিরিক্ত কন্ডোম দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রাথমিক ধাক্কা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে।
অলিম্পিক ভিলেজ আসলে একটা ছোট্ট শহরের মতো। এখানে শুধু থাকার জায়গা নয়, থাকে বড় জিম, বিনোদনের ব্যবস্থা, টেবিল ফুটবল, এয়ার হকি, এমনকি পিয়ানোও। খেলোয়াড়দের মানসিক চাপ কমাতে নানা আয়োজন থাকে। সফট ড্রিঙ্কস মেশিন থেকে শুরু করে বিশ্রামের জায়গা—সবই পরিকল্পিতভাবে সাজানো।
এই পরিবেশে বন্ধুত্ব হওয়া খুবই স্বাভাবিক। অনেক ক্রীড়াবিদই বলেন, অলিম্পিক ভিলেজে কাটানো সময় তাঁদের জীবনের সেরা অভিজ্ঞতার একটি। তাই নিরাপত্তা ও সচেতনতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইতালির লম্বার্ডি অঞ্চলের গভর্নর Attilio Fontana এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, অলিম্পিক ভিলেজে বিনামূল্যে কন্ডোম দেওয়া কোনও নতুন বিষয় নয়। ১৯৮৮ সাল থেকেই এই নিয়ম চলছে। এর মূল উদ্দেশ্য হল যৌনরোগ সংক্রমণ রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, কেউ যদি বিষয়টিকে অদ্ভুত ভাবেন, তবে তারা অলিম্পিক্সের নিয়ম সম্পর্কে অবগত নন। কারণ এটি ক্রীড়াবিদদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ।
অলিম্পিক্স মানেই বিশ্বমঞ্চ। তাই ছোট ঘটনাও বড় আলোচনায় পরিণত হয়। কন্ডোমের ঘাটতি হয়তো সাময়িক সমস্যা, কিন্তু এটি তুলে ধরেছে পরিকল্পনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রশ্ন।
অনেকে বলছেন, এত বড় আন্তর্জাতিক আসরে এমন ভুল হওয়া উচিত ছিল না। আবার কেউ কেউ বলছেন, এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে অলিম্পিক ভিলেজে সম্পর্ক ও সামাজিক মেলামেশা কতটা বাস্তব ও স্বাভাবিক।

আয়োজকেরা ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছেন। শীতকালীন অলিম্পিক্স শেষ হতে এখনও বেশ কিছু দিন বাকি। তাই নতুন কন্ডোম দ্রুত ভিলেজে পৌঁছে দেওয়া হবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
এই পুরো ঘটনাটি আমাদের একটা জিনিস মনে করিয়ে দেয়—অলিম্পিক্স শুধু পদক জয়ের লড়াই নয়। এটি তরুণদের মিলনমেলা। এখানে ক্রীড়া, সংস্কৃতি, বন্ধুত্ব—সবকিছুর মিশেল থাকে। আর সেই কারণেই স্বাস্থ্য ও সচেতনতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
শেষ পর্যন্ত হয়তো এই কন্ডোম সংকটও কয়েক দিনের মধ্যেই মিটে যাবে। কিন্তু ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, পরিকল্পনায় সামান্য ঘাটতিও কত বড় আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
অলিম্পিক্সের মঞ্চে যেমন প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি প্রস্তুতিও। আর সেই প্রস্তুতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নিরাপত্তা, দায়িত্ব আর সচেতনতার বার্তা।


