বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বড় জয়ের পর দুই বাংলার রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। নির্বাচনে জয় নিশ্চিত হতেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। তবে শুভেচ্ছা বার্তাতেই থেমে থাকেননি তিনি। এবার সরাসরি উপহার হিসেবে পাঠালেন ফুল আর বাংলার বিখ্যাত মিষ্টি। আর এই ঘটনাকেই অনেকে বলছেন দুই বাংলার নতুন ‘মিষ্টি কূটনীতি’র সূচনা।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক শুধু রাজনীতির নয়, এটা আবেগেরও। ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার—সবকিছুতেই রয়েছে মিল। ইলিশ মাছ, আম, মিষ্টি—এইসব সাধারণ জিনিসই অনেক সময় বড় কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। রাষ্ট্রনেতাদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে এসব সাংস্কৃতিক বিনিময় দুই বাংলার সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে।
একসময় গ্রীষ্ম এলেই দুই দেশের মধ্যে আম বিনিময়ের খবর শিরোনামে আসত। বিশেষ করে বাংলাদেশের হাঁড়িভাঙা আম উপহার হিসেবে পাঠানো হতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে। এই আম কূটনীতি দুই দেশের সম্পর্ককে নরম ও আন্তরিক করে তুলেছিল। এবার সেই জায়গায় এসেছে মিষ্টি কূটনীতি।
বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতেই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ এক অন্তর্বর্তী সময়ের পর জনগণ ভোট দিয়ে নতুন নেতৃত্ব বেছে নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে।
নির্বাচনে জয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে ‘তারেকভাই’ সম্বোধন করে শুভেচ্ছা জানান। এই সম্বোধন শুধু রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত সৌহার্দ্যেরও ইঙ্গিত দেয়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, নতুন সরকারের আমলে দুই বাংলার সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও গতিশীল হবে।
শুভেচ্ছা বার্তার পরপরই পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিশেষ উপহার পাঠানো হয় ঢাকার গুলশনে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ফুল ও বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী বাংলার মিষ্টি সেখানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। উপস্থিত ছিলেন দলের মিডিয়া সেলের সদস্যরাও।
রাজনীতিতে প্রতীকী বার্তার গুরুত্ব অনেক। ফুল মানে শুভকামনা, আর মিষ্টি মানে সম্পর্কের মাধুর্য। তাই এই উপহারকে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল উষ্ণ। দুই নেত্রীর সাক্ষাতে আন্তরিকতার ছবি বহুবার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কের প্রেক্ষাপট বদলে যায়।
রাজনীতি পরিবর্তনশীল। নেতৃত্ব বদলালে সম্পর্কের ধরণও বদলায়। কিন্তু ভৌগোলিক নৈকট্য ও সাংস্কৃতিক মিলের কারণে দুই বাংলার যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয় না। বরং নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়। মমতার এই উপহার সেই নতুন সমীকরণেরই ইঙ্গিত।
আপনি ভাবতেই পারেন, মিষ্টি পাঠানোতে এত গুরুত্ব কেন? আসলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনেক সময় ছোট ছোট ইঙ্গিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ধরুন, প্রতিবেশীর সঙ্গে আপনার মনোমালিন্য হয়েছে। হঠাৎ একদিন তিনি আপনার বাড়িতে মিষ্টি পাঠালেন। এতে কি বরফ গলতে শুরু করে না? ঠিক তেমনই রাষ্ট্রীয় সম্পর্কেও এই প্রতীকী পদক্ষেপ বড় প্রভাব ফেলে।
বাংলার মিষ্টি শুধু খাবার নয়, এটি ঐতিহ্যের অংশ। রসগোল্লা, সন্দেশ, মিষ্টি দই—এইসব নাম শুনলেই বাঙালির মনে আনন্দের অনুভূতি জাগে। তাই মিষ্টি পাঠানো মানে সম্পর্কের মাধুর্য বাড়ানোর চেষ্টা।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত বাণিজ্য, সংস্কৃতি বিনিময়, পর্যটন, শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দুই পক্ষ ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখে, তাহলে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই ভাষা ও সংস্কৃতি এই সহযোগিতাকে সহজ করে দেয়।
বাঙালির রাজনীতি অনেক সময় আবেগে ভর করে। ‘দিদি’ আর ‘তারেকভাই’—এই সম্বোধনগুলো সেই আবেগেরই প্রকাশ। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভাষা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার ইঙ্গিত।
দুই বাংলার মানুষই চায় সম্পর্ক শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক হোক। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সাংস্কৃতিক বন্ধন অটুট থাকলে সম্পর্ক ভাঙে না। মমতার এই পদক্ষেপ সেই বন্ধনকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল।
এখন প্রশ্ন উঠছে, এই মিষ্টি কূটনীতি কি আরও বড় কূটনৈতিক সহযোগিতার পথ খুলবে? অতীতে যেমন আম বিনিময় সম্পর্ককে উষ্ণ করেছিল, তেমনই কি এবার মিষ্টি নতুন অধ্যায় রচনা করবে? তারেক রহমান কীভাবে এই সৌজন্যের প্রতিদান দেবেন, সেটিও দেখার বিষয়।
একটি বিষয় পরিষ্কার—দুই বাংলার সম্পর্ক কখনও শুধু রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এটি সংস্কৃতি, ভাষা ও মানুষের হৃদয়ের সংযোগে গড়ে ওঠে। ফুল ও মিষ্টির এই বিনিময় সেই হৃদয়ের কথাই বলে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই বাংলার সম্পর্ক আবারও আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও যদি সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সম্পর্ক আরও মধুর হবে—ঠিক যেমন মিষ্টির স্বাদ।

