ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান শেষে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। এই জয়ের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে যে মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি চলছে, সেখানে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে একটি আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ৩০ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ১৮ জন প্রতিমন্ত্রী থাকবেন। তবে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, শুরুর দিকে মন্ত্রিসভার পরিধি আরও কিছুটা বড় হতে পারে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের জন্য সরকারি পরিবহন ও বাসভবন প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে চূড়ান্ত সংখ্যা ৪০ জনের কাছাকাছি যেতে পারে।
মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ শেষ হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন মন্ত্রীদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে জানা গেছে। সবকিছু এখনো গোপন রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা শুধুমাত্র হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেই রয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে।
বিকেল চারটায় জাতীয় সংসদ ভবন-এর দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর উপস্থিতিতে শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই তিন দশক পর দেশ পেতে যাচ্ছে নতুন নেতৃত্ব এবং নতুন প্রশাসনিক গতি।
এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হতে যাচ্ছে নবীন ও প্রবীণদের একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা। অনেক পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত নেতাকে হয়তো এবার মন্ত্রিসভায় দেখা যাবে না। কারণ নেতৃত্ব এবার গুরুত্ব দিচ্ছে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং তারুণ্যের মিশ্রণে একটি কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলার দিকে।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-এর নাম সম্ভাব্য তালিকায় থাকলেও তিনি নাকি মন্ত্রিত্বের চেয়ে সংসদের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী। তাঁর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিক সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও প্রাণবন্ত করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
এছাড়া অভিজ্ঞ নেতৃত্বের তালিকায় আরও যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে আছেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আব্দুল মঈন খান এবং মির্জা আব্বাস। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
অর্থনীতি, পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্র—এই তিনটি খাতকে সব সময়ই সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। এই দায়িত্বগুলো এমন মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত।
এই তালিকায় আলোচনায় রয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ এবং আলতাফ হোসেন চৌধুরী। তাদের অভিজ্ঞতা সরকারের নীতিনির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এইবারের মন্ত্রিসভায় একটি নতুন দিক যোগ হতে যাচ্ছে, আর সেটি হলো টেকনোক্র্যাট কোটার ব্যবহার। অর্থাৎ, নির্বাচনে অংশ না নিয়েও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ বিশেষজ্ঞদের মন্ত্রিসভায় নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অন্তত চারজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে এই কোটায় যুক্ত করার আলোচনা চলছে।
এতে করে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যখাতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসতে পারে। যেমন একজন ভালো চিকিৎসক যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান, তাহলে বাস্তব সমস্যাগুলো দ্রুত বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আবার প্রযুক্তি খাতে অভিজ্ঞ কেউ থাকলে ডিজিটাল উন্নয়ন আরও দ্রুত এগোতে পারে।
এই সরকারের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হতে পারে তরুণ নেতৃত্বের উপস্থিতি। অনেক নতুন মুখ সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব দিলে তারা নতুন চিন্তা নিয়ে কাজ করতে পারে।
টেকনোক্র্যাট বা নতুন নেতৃত্বের আলোচনায় যাদের নাম উঠে আসছে, তাদের মধ্যে সানজিদা ইসলাম তুলি এবং মাহদী আমিনের মতো তরুণ ও মেধাবী নেতাদের কথা শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া যুগপৎ আন্দোলনে সক্রিয় থাকা শরিক দলের নেতাদেরও মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
শরিক দলগুলোর মধ্যে তরুণ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে আন্দালিব রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি এবং নুরুল হক নুর-এর নাম জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে সংসদকে শক্তিশালী করা এবং মন্ত্রীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তারেক রহমান আগেই দলীয় বৈঠকে জানিয়েছেন, মন্ত্রীরা সরাসরি সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। এতে সংসদীয় আলোচনা বাড়বে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আরও স্বচ্ছভাবে নেওয়া যাবে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংসদের উপনেতা পদে একজন অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এতে সংসদের কার্যক্রম আরও সক্রিয় ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০০১ সালের পর এবারই প্রথম দলটি একক শক্তিতে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। তবে তারা শুধু নিজেদের দল নিয়ে নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে চায়। শরিক দল ও বিভিন্ন মতের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কৌশল বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ হবে। এতে করে নীতিনির্ধারণ আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।
একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে সরকার গঠন করা মানেই শুধু মন্ত্রিসভা তৈরি নয়। অর্থনীতি শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নত করা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা—এসব বড় বড় চ্যালেঞ্জ সামনে অপেক্ষা করছে।
নতুন মন্ত্রিসভা যদি অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সঠিক সমন্বয় করতে পারে, তাহলে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সহজ হবে। মানুষও চায় এমন একটি সরকার, যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানে কাজ করে।
শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় পর নতুন নেতৃত্বের হাতে প্রশাসনের দায়িত্ব যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশা তৈরি করেছে।
এখন সবার চোখ নতুন মন্ত্রিসভার দিকে। কে কোন দায়িত্ব পাবেন, কার হাতে কোন মন্ত্রণালয় যাবে—এই কৌতূহল সবার মধ্যেই কাজ করছে। তবে শেষ পর্যন্ত মানুষ যা দেখতে চায়, তা হলো কার্যকর নেতৃত্ব এবং দেশের উন্নয়নে দৃশ্যমান পরিবর্তন।
নতুন এই মন্ত্রিসভা যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে, তাহলে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন গতির সূচনা হতে পারে। সময়ই বলে দেবে এই নতুন অধ্যায় কতটা সফল হয়, তবে শুরুটা যে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে, তা বলাই যায়।



