বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা মানুষ বহু বছর মনে রাখে। ঠিক তেমনই এক অধ্যায়ের নাম তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে তিনি যে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেছেন, তা যেন একেবারে ঝড়ের গতিতে এগিয়েছে। ভোটার তালিকায় নাম ওঠার মাত্র ৫৩ দিনের মাথায় দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া—এটি সত্যিই নজিরবিহীন।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। অনেক সমর্থকের কাছে এটি ছিল আবেগঘন মুহূর্ত। প্রায় দুই দশক পর দেশে ফিরে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এই প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত নয়, রাজনৈতিকভাবেও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দেশে ফেরার মাত্র দুই দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২৭ ডিসেম্বর, তিনি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের নাগরিক অধিকার চর্চার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তার সঙ্গে তার কন্যা জাইমা রহমানও একই দিনে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হন।
ভোটার হওয়ার পর মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসন—ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬—থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং উভয় আসনেই বিজয়ী হন।
রাজনীতিতে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করেন, ধাপে ধাপে এগিয়ে যান। কিন্তু তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ঘটনাপ্রবাহ যেন অনেক দ্রুত। ভোটার তালিকায় নাম ওঠার অল্প সময়ের মধ্যেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এই শপথ ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই তাকে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়। দলের ভেতরে তার প্রতি আস্থার প্রতিফলন ছিল এই সিদ্ধান্ত। এরপর তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং আগামী পাঁচ বছরের জন্য সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এত অল্প সময়ে ভোটার থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। সাধারণত রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে সময় লাগে, অভিজ্ঞতা লাগে, দীর্ঘ পথচলা লাগে। কিন্তু তারেক রহমানের ক্ষেত্রে সময় যেন ভিন্ন গতিতে চলেছে।
দুটি আসনে বিজয়ী হওয়ায় আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে তাকে একটি আসন ছেড়ে দিতে হয়। তিনি বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান। এর ফলে বগুড়া-৬ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে এবং সেখানে শিগগিরই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি রাজধানী ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনকে প্রতিনিধিত্বের জন্য বেছে নেন, যা রাজনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদের তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান ও তার কন্যা গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি ঠিকানাকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বর্তমান ঠিকানা হিসেবে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর এলাকার একটি ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।
এর আগে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও একই ঠিকানায় ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হন। প্রবাসে থেকেও ভোটার হওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি দেশে ফিরে সরাসরি ভোটার হতে চেয়েছিলেন। এতে বোঝা যায়, তিনি দেশের মাটিতেই রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করতে আগ্রহী ছিলেন।
একটু ভেবে দেখুন—সাধারণত কেউ ভোটার হন, তারপর হয়তো অনেক বছর পর স্থানীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন, ধীরে ধীরে দলীয় পদ পান, তারপর জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসেন। কিন্তু এখানে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভোটার হওয়ার মাত্র ৫৩ দিনের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে অধিষ্ঠিত হওয়া সত্যিই অভূতপূর্ব।
এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। এতে যেমন রাজনৈতিক কৌশল, সংগঠনের শক্তি ও জনসমর্থনের বিষয় রয়েছে, তেমনি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও বড় ভূমিকা আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর দেশে ফেরার সময় নির্বাচনকে সামনে রেখে তার রাজনৈতিক প্রস্তুতি ছিল সুসংগঠিত। দেশে ফেরার পর দ্রুত ভোটার হওয়া, নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং দলীয় সমর্থন নিশ্চিত করা—সবকিছু যেন একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
ঢাকা-১৭ আসনটি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে নির্বাচিত হওয়া মানে জাতীয় রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করা। একই সঙ্গে বগুড়া-৬ আসনে জয় তার উত্তরাঞ্চলে রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
এখন সবার চোখ ভবিষ্যতের দিকে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান কেমন নেতৃত্ব দেবেন, কী ধরনের নীতি গ্রহণ করবেন, এবং দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে কী পরিবর্তন আনবেন—এসব প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
মাত্র ৫৩ দিনে ভোটার থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে ইতোমধ্যেই আলোচিত। তবে শেষ পর্যন্ত তার নেতৃত্বের সফলতা নির্ভর করবে তার সিদ্ধান্ত, দক্ষতা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ওপর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তারেক রহমানের এই দ্রুত উত্থান একটি অনন্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা, দ্রুত ভোটার হওয়া, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং অল্প সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ—সব মিলিয়ে এটি এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক যাত্রা।
সময়ই বলে দেবে এই যাত্রা কতটা সফল হবে। তবে এতটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ভোটার থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এই ৫৩ দিনের গল্প বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচিত হবে।



