বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন দুই তারকা—সাকিব আল হাসান এবং মাশরাফি বিন মুর্তজা। তাদের দেশে ফেরা এবং জাতীয় দলে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে সরব হয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, চলমান মামলাগুলোর দ্রুত ও ন্যায্য নিষ্পত্তি হলে এই দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে আবার বাংলাদেশের ক্রিকেটে দেখা যেতে পারে।
এই বক্তব্য নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়েছে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। কারণ সাকিব ও মাশরাফি শুধু খেলোয়াড় নন, তারা একেকটা আবেগ, একেকটা ইতিহাস।
বিকেলে শপথ নেওয়ার পর সন্ধ্যায় মিরপুরে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আমিনুল হক। সেখানে তিনি পরিষ্কারভাবে জানান, দেশের স্বার্থেই বিষয়টি দ্রুত সমাধান হওয়া দরকার। তার মতে, আইনি জটিলতা দীর্ঘায়িত হলে শুধু খেলোয়াড় নয়, দেশের ক্রিকেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, মামলাগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে বিবেচনা করে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিলে সাকিব ও মাশরাফির দেশে ফেরার পথ সহজ হবে। তিনি এই প্রক্রিয়ায় সহনশীলতা ও ইতিবাচক মনোভাব দেখানোর কথাও উল্লেখ করেন।
এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট—সরকারি অবস্থান থেকে সরাসরি কাউকে ছাড় দেওয়ার কথা তিনি বলেননি। বরং আইনের ভেতরে থেকেই দ্রুত সমাধানের কথা বলেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার আন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সে সময় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং জাতীয় দলের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান দেশে ফেরেননি। অন্যদিকে সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজাকেও দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
দুজনের বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা হয়েছে। সাকিবের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ছাড়াও কয়েকটি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। মাশরাফির বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা রয়েছে।
এই আইনি জটিলতার কারণেই তারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং জাতীয় দলে ফিরতে পারছেন না। ফলে প্রশ্ন উঠছে—আইন ও ক্রিকেটের এই সংঘাত কীভাবে মেটানো সম্ভব?
এখানেই আসে মূল প্রশ্ন—তারা কি সত্যিই আবার বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামতে পারবেন?
আমিনুল হকের বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, সরকার চাইলে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে সেটি হতে হবে ন্যায়বিচারের সীমার মধ্যেই।
ক্রিকেট বোঝেন এমন যে কেউ জানেন, সাকিব আল হাসান এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। অন্যদিকে মাশরাফি শুধু একজন বোলার নন, তিনি নেতৃত্বের প্রতীক। তার অধিনায়কত্বেই বাংলাদেশ বহু ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে।
তাই তাদের ফিরে আসা মানে শুধু দুজন খেলোয়াড়ের ফেরা নয়, বরং দলীয় অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাসের পুনর্জন্ম।
এদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়েও আলোচনা কম হয়নি। গত বছরের অক্টোবরে বোর্ড নির্বাচনের পর সভাপতি হন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম।
এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন আমিনুল হক। তবে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। তিনি জানান, এখন তিনি দায়িত্বশীল অবস্থানে আছেন। তাই সরাসরি সমালোচনা না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে চান।
তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা International Cricket Council–এর নিয়ম মেনেই বোর্ড পরিচালনায় এগোতে হবে। অর্থাৎ, দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত যেন আন্তর্জাতিক নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হবে।
ক্রিকেটে একটি বড় বিষয় হলো বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল সাধারণত সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না। যদি কোনো দেশে সরকার অতিরিক্ত প্রভাব খাটায়, তাহলে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
তাই আমিনুল হকের অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে এগোতে চান। এর মানে হলো—সরকার, বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষ একসঙ্গে বসে সমাধানের পথ খুঁজবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। তবে সঠিক কৌশল নিলে সম্ভব।
বাংলাদেশে ক্রিকেট মানেই আবেগ। একটা ম্যাচে হারলে মানুষ রাতের ঘুম হারায়, আর জিতলে আনন্দে রাস্তায় নেমে আসে। সেই দেশের দুই বড় তারকা যখন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভক্তদের মন খারাপ হয়।
অনেকে মনে করেন, আইন তার নিজের পথে চলবে। আবার অনেকে চান, দেশের স্বার্থে দ্রুত সমাধান হোক।
বাস্তবতা হলো—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তবে দীর্ঘসূত্রিতা যেন কারও ক্যারিয়ার পুরোপুরি শেষ করে না দেয়, সেটিও ভাবার বিষয়।
এখন সামনে দুটি পথ—একটি হলো মামলাগুলো দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা, অন্যটি দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি। দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলে শুধু দুই ক্রিকেটারই উপকৃত হবেন না, বাংলাদেশ ক্রিকেটও স্থিতিশীলতা ফিরে পাবে।
আমিনুল হকের বক্তব্যে যে বার্তা পাওয়া যায়, তা হলো সমঝোতা ও আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে এগোনোর ইচ্ছা। এটি ইতিবাচক সংকেত।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে আইনি প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং ক্রিকেট বোর্ডের সমন্বয়ের ওপর। তবে একটা কথা নিশ্চিত—সাকিব ও মাশরাফির মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ফিরে পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট আবারও নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করবে।
সময়ের অপেক্ষা এখন—আইনি জট কবে কাটে, আর দেশের দুই তারকা কবে আবার মাঠে নামেন লাল–সবুজের জার্সিতে।



