বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুযায়ী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করেছে। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) এ নিয়োগ কার্যকর হয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে এক নতুন পর্ব।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন ব্যক্তিকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, সংসদে যে দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে, তাদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন।
এই সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করেই রাষ্ট্রপতি তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন পাওয়ায় তাকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পরই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নিয়োগটি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয় অর্জন করে। এই নিরঙ্কুশ জয়ের ফলে দলটি এককভাবে সরকার গঠনের সুযোগ পায়। বিকেলে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় সরকার গঠনে কোনো জোট নির্ভরতা রাখতে হয়নি বিএনপিকে। ফলে দলটি নিজেদের পরিকল্পনা ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ৫০ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা। এর মধ্যে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক কাঠামোতে নতুন রূপ এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে অভিজ্ঞ ও নবীন নেতৃত্বের সমন্বয় করার চেষ্টা দেখা গেছে।
নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ বিলুপ্ত হয়েছে বলে গণ্য করা হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে ন্যস্ত হয়েছে।
প্রায় দুই দশক পর চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করল বিএনপি। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন এবং নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতির পর এই প্রত্যাবর্তন দলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে বিএনপি একাধিকবার সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তবে এবারই প্রথমবারের মতো তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তার নেতৃত্বে দলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ও নীতিনির্ধারণ কেমন হবে, তা নিয়ে দেশজুড়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন তারেক রহমান। দলীয় চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সংগঠন পুনর্গঠন, রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ এবং নির্বাচনী প্রস্তুতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এবার সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সামনে রয়েছে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই হবে তার সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
নতুন সরকার শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে। নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা সেই কাঠামো এখন আর বহাল নেই। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
এতে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও নীতিনির্ধারণে এখন সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় তারেক রহমানের সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারবে। তবে একই সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে বহুগুণ। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা—এসব ক্ষেত্রেই নতুন সরকারের কর্মদক্ষতা পরীক্ষা হবে। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসবে।
সংবিধানের বিধান অনুসরণ করে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও গেজেট প্রকাশ দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর বিএনপির সরকার গঠন এবং ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা ঘোষণার মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
এখন সবার নজর নতুন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের কার্যক্রমের দিকে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, স্থিতিশীল প্রশাসন এবং উন্নয়নমুখী নীতি গ্রহণের মাধ্যমেই এই সরকার তাদের সাফল্যের মানদণ্ড নির্ধারণ করবে। সময়ই বলে দেবে, এই নতুন অধ্যায় দেশের রাজনীতিতে কতটা দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী হয়ে উঠবে।



