প্রযুক্তি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে শরীরের ছোট থেকে ছোট পরিবর্তনও নজরে রাখা সম্ভব। স্মার্ট ঘড়ি যেমন আমাদের হার্টবিট মাপে, তেমনি এবার তৈরি হয়েছে এমন এক অভিনব স্মার্ট অন্তর্বাস, যা সারাদিনে কতবার বাতকর্ম হচ্ছে এবং কতটা গ্যাস নির্গত হচ্ছে তার নির্ভুল হিসাব রাখবে। বিষয়টি শুনতে মজার লাগলেও এর পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য গবেষণা।
প্রথমে একটা বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। বাতকর্ম বা গ্যাস নির্গমন মানবদেহের সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। আমরা যখন খাবার খাই, বিশেষ করে ডাল, শাকসবজি বা ফাইবারযুক্ত খাবার, তখন অন্ত্রে হজমের সময় গ্যাস তৈরি হয়। সেই গ্যাস শরীর থেকে বেরিয়ে আসাই স্বাভাবিক।
অনেকেই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে থাকেন, বিশেষ করে অন্যের সামনে হলে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এটি দেহের সুস্থ কার্যপ্রণালির অংশ। বরং একেবারেই গ্যাস না হওয়া অনেক সময় হজমের সমস্যা বা অন্ত্রের জটিলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
এই অভিনব স্মার্ট আন্ডারওয়্যারে ব্যবহার করা হয়েছে একটি বিশেষ ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল সেন্সর। এই সেন্সর বাতকর্মের সময় নির্গত গ্যাস শনাক্ত করে তার পরিমাণ ও ঘনত্ব রেকর্ড করে। বিশেষ করে হাইড্রোজেন গ্যাসের মাত্রা মাপার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি হজম প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
গবেষকদের দাবি, একজন মানুষ গড়ে দিনে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ বার পর্যন্ত বাতকর্ম করেন। তবে এই সংখ্যা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কারও ক্ষেত্রে এটি দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে দিনে মাত্র ৪ থেকে ৫ বারও হতে পারে। খাবারের ধরন, হজমের ক্ষমতা এবং অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যের ওপর এই সংখ্যা নির্ভর করে।
ধরুন দুজন মানুষ একই খাবার খেলেন। একজনের সারাদিনে বেশ কয়েকবার গ্যাস হলো, অন্যজনের খুব কম। কেন এমন হয়?
যাঁরা বেশি ফাইবারযুক্ত খাবার খান, তাঁদের অন্ত্রে বেশি গ্যাস তৈরি হতে পারে। তবে মজার বিষয় হলো, এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা প্রচুর ফাইবার খেয়েও খুব কম বাতকর্ম করেন। আবার কেউ কেউ অল্প খাবার খেলেও তুলনামূলক বেশি গ্যাস অনুভব করেন।
এই পার্থক্য বুঝতেই গবেষকেরা স্বেচ্ছাসেবক খুঁজছেন। তাঁদের তিনটি ভাগে ভাগ করা হবে—
প্রথম দল: যারা উচ্চ ফাইবার খাবার খেলেও কম গ্যাস নির্গত করেন।
দ্বিতীয় দল: যাদের বাতকর্মের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।
তৃতীয় দল: যারা মাঝামাঝি অবস্থায় আছেন।
এই গবেষণার মাধ্যমে বোঝা যাবে অন্ত্রের স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং গ্যাস উৎপাদনের সম্পর্ক ঠিক কতটা গভীর।
আমরা সাধারণত পেটের সমস্যাকে হালকাভাবে নেই। কিন্তু বারবার পেট ফাঁপা, অস্বাভাবিক গ্যাস বা অস্বস্তি অনেক সময় ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বা অন্যান্য হজমজনিত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
স্মার্ট অন্তর্বাস নিয়মিত ডাটা সংগ্রহ করলে চিকিৎসকেরা রোগীর হজম প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন। ধরুন কেউ বললেন তাঁর প্রায়ই পেট ফাঁপে। শুধু কথার ওপর নির্ভর না করে, সেন্সরের তথ্য দেখে বোঝা যাবে আসলেই কতবার গ্যাস হচ্ছে এবং কোন সময়ে বেশি হচ্ছে। এতে রোগ নির্ণয় সহজ হতে পারে।
আজকাল আমরা স্মার্টওয়াচ দিয়ে ঘুম মাপি, হাঁটার হিসাব রাখি, এমনকি স্ট্রেস লেভেলও দেখি। ঠিক তেমনি স্মার্ট অন্তর্বাস ভবিষ্যতে হজম স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ভাবুন তো, সারাদিনের খাবারের পর আপনার মোবাইলে নোটিফিকেশন এলো—আজ গ্যাসের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তখন আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন কোন খাবারটি আপনার শরীরের সঙ্গে মানাচ্ছে না। এতে খাদ্যাভ্যাস বদলানো সহজ হবে।
গবেষকেরা এখন এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা আরও নিখুঁতভাবে যাচাই করতে চান। তাই বিভিন্ন ধরনের মানুষের ওপর পরীক্ষা চালানো হবে। লক্ষ্য একটাই—মানবদেহের অন্ত্রের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা পাওয়া।
তাঁদের আশা, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি শুধু গ্যাস গণনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য, হজমের গতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সূচকও জানাতে পারবে।
আমরা অনেক সময় বাতকর্ম নিয়ে হাসাহাসি করি বা লজ্জা পাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি শরীরের একেবারে স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। বরং এর মাধ্যমে শরীর নিজের ভেতরের ভারসাম্য বজায় রাখে।
স্মার্ট অন্তর্বাসের মতো প্রযুক্তি আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে—যে বিষয়কে আমরা অস্বস্তিকর ভাবি, সেটিই হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সূচক। যেমন রক্তচাপ বা রক্তে শর্করার মাত্রা মাপা জরুরি, তেমনি অন্ত্রের স্বাস্থ্য বোঝাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
প্রথম শুনলে বিষয়টি অদ্ভুত লাগতেই পারে। কিন্তু একটু ভাবলেই বোঝা যায়, এটি স্বাস্থ্য প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত। নিয়মিত ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে হজম সংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
হয়তো খুব শিগগিরই স্মার্ট অন্তর্বাস হয়ে উঠবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের এক নতুন সহচর। আর তখন বাতকর্ম আর শুধু বিব্রতকর ঘটনা থাকবে না, বরং হয়ে উঠবে সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।



