বাংলাদেশের নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অভিজ্ঞ কূটনীতিক খলিলুর রহমান। আর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম।
নতুন এই দায়িত্ব বণ্টন ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা। অনেকেই মনে করছেন, পেশাদার কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সক্রিয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার সমন্বয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, শপথ গ্রহণের পরই প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন। ৫০ সদস্যের এই বৃহৎ মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। অভিজ্ঞতা ও নতুন নেতৃত্ব—দুইয়ের মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো সংবেদনশীল ও কৌশলগত দপ্তরে একজন পেশাদার কূটনীতিককে দায়িত্ব দেওয়াকে অনেকেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। কারণ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। একদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে পররাষ্ট্রনীতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া খলিলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরেই কূটনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত নাম। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিশ্লেষণে দক্ষতা দেখিয়েছেন। এর আগে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি রোহিঙ্গা সংকট ও অন্যান্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়ে ‘হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক সংলাপ, নিরাপত্তা ইস্যু ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েছে।
ভাবুন, কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক যেন বাড়ির প্রধান দরজা। বাইরে থেকে কে আসবে, কার সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে—সবই নির্ভর করে এই দরজার ওপর। সেই দরজার চাবি এখন একজন পেশাদার কূটনীতিকের হাতে। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আরও কৌশলী ও পরিকল্পিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘদিনের বড় চ্যালেঞ্জ। এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা সহজ নয়। খলিলুর রহমান এই বিষয়ে আগে থেকেই সরাসরি কাজ করেছেন। ফলে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক শক্তি এবং দাতা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত আগ্রহ এখানে বাড়ছে। এমন সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন অভিজ্ঞ নিরাপত্তা বিশ্লেষক থাকাটা সরকারের জন্য কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া শামা ওবায়েদ ইসলাম বিএনপির রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তিনি ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দলের অবস্থান তুলে ধরতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক ফোরামে মতামত প্রকাশ—এসব ক্ষেত্রে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক কূটনীতি ও জনসম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা মন্ত্রণালয়ের কাজে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অনেক সময় শুধু নীতিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয়, দরকার রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা। শামা ওবায়েদ সেই জায়গাটিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেন। কারণ তিনি মাঠপর্যায়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ—দুই দিকেই কাজ করেছেন।
নতুন সরকারের এই পদায়নকে অনেকে “ডুয়াল স্ট্র্যাটেজি” হিসেবে দেখছেন। একদিকে পেশাদার কূটনীতিক, অন্যদিকে সক্রিয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি। এই সমন্বয় আন্তর্জাতিক আলোচনায় ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
যেমন ধরুন, একটি জটিল আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেখানে একজন কৌশলী কূটনীতিক চুক্তির খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করবেন। একই সঙ্গে একজন রাজনৈতিক নেতা দেশের অভ্যন্তরীণ জনমত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরবেন। এই দুইয়ের সমন্বয়ই কার্যকর পররাষ্ট্রনীতির মূল চাবিকাঠি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ ও নবীন নেতৃত্বের সমন্বয় করা হয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক পদায়ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বার্তা—বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন গতি আনতে চায়।
বিশেষ করে অর্থনৈতিক কূটনীতি, প্রবাসী কল্যাণ, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো এখন অগ্রাধিকার পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব জোরদার করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী শিগগিরই নিজ নিজ দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কূটনৈতিক মহলে ইতোমধ্যে তাদের নিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন সরকারের পররাষ্ট্র কূটনীতি এখন নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার সমন্বয় কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে শুরুটা যে গুরুত্বের সঙ্গে করা হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।



