দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন প্রকাশিত ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নীতিমালা’ অনুযায়ী এখন থেকে কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পুনঃভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এই নীতিমালা শুধু একটি নির্দেশনা নয়, বরং দেশের স্কুল, কলেজ ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কার্যক্রমকে সঠিক পথে আনার একটি বড় উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পুনঃভর্তি ফি, অতিরিক্ত চার্জ এবং অজানা খাতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল। নতুন নিয়ম সেই অনিয়ম বন্ধ করার জন্যই আনা হয়েছে।
অনেক অভিভাবকই অভিযোগ করতেন, একই প্রতিষ্ঠানে পড়া চালিয়ে গেলেও প্রতি বছর নতুন করে ভর্তি ফি দিতে হয়। এটি অনেকের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করত। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো এই বাড়তি খরচে কষ্টে পড়ত।
নতুন নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, একবার কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে গেলে পরবর্তীতে তাকে আর পুনঃভর্তি ফি দিতে বাধ্য করা যাবে না। অর্থাৎ ক্লাস পরিবর্তন বা নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও আলাদা করে ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। এতে করে পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ কমবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে টিউশন ফি নিতে হবে। স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ এবং ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে নির্দিষ্ট নীতিমালার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া যাবে না।
অনেক সময় দেখা যায়, টিউশন ফি ছাড়াও নানা নামে টাকা নেওয়া হয়। যেমন উন্নয়ন ফি, সেশন চার্জ বা অন্য কোনো অজুহাতে বাড়তি অর্থ নেওয়া। এখন থেকে এমন নতুন কোনো খাত তৈরি করে অর্থ আদায় করা নিষিদ্ধ। এই নিয়ম কার্যকর হলে অভিভাবকদের অপ্রয়োজনীয় খরচ অনেকটাই কমে যাবে।
এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের প্রতিটি হিসাব পরিষ্কার রাখা। এজন্য সব প্রতিষ্ঠানে সরকারি আর্থিক বিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের যৌথ স্বাক্ষরের মাধ্যমে। অর্থাৎ কোনো একক ব্যক্তি ইচ্ছামতো টাকা তোলা বা খরচ করার সুযোগ পাবেন না। এতে করে দুর্নীতির ঝুঁকি কমবে।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানের সব আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণের দায়িত্ব থাকবে প্রতিষ্ঠান প্রধানের ওপর। ভবিষ্যতে কোনো অভিযোগ উঠলে যেন সহজেই হিসাব যাচাই করা যায়, সেই বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে যদি কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নিতে হবে। শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তিগতভাবে সভাপতি ও প্রতিষ্ঠান প্রধান যৌথভাবে দায়ী থাকবেন।
এতে বোঝা যায়, এখন থেকে অর্থ ব্যবস্থাপনায় কোনো গাফিলতি করলে তা সহজে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। নিয়ম ভাঙলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই কঠোরতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংককে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর ফলে অর্থের লেনদেন আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ হবে।
শিক্ষার্থীদের দেওয়া ফি, দান-অনুদান কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি থেকে আসা আয়—সব ধরনের অর্থ নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থাও ব্যবহার করা যাবে, যেমন সোনালী ব্যাংক পরিচালিত সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ে (SPG) বা সরকারি অন্যান্য ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ে।
এতে করে নগদ লেনদেন কমবে এবং প্রতিটি টাকার হিসাব রাখা সহজ হবে।
তবে জরুরি পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কিছু ছাড় রাখা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিশেষ প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নগদ অর্থ নেওয়া যাবে।
কিন্তু সেক্ষেত্রেও নিয়ম মানতে হবে। নগদে নেওয়া অর্থ দুই কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে। এর উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘ সময় নগদ অর্থ প্রতিষ্ঠানে পড়ে না থাকা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
আগে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে নতুন খাত তৈরি করে অর্থ আদায় করত বা পুরোনো খাতে পরিবর্তন আনত। নতুন নীতিমালায় এই বিষয়েও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
এখন থেকে আয় বা ব্যয়ের কোনো খাতে সংযোজন, বিয়োজন বা পরিবর্তন করতে হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান ইচ্ছামতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এতে করে অযৌক্তিক অর্থ আদায়ের সুযোগ কমে যাবে।
শিক্ষা বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত খাতে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তা যথাযথ নিয়মে জমা দিতে হবে। এই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে যে শিক্ষার্থীদের দেওয়া টাকা সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে।
অনেক সময় এই ধরনের অর্থ জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব বা গড়মিলের অভিযোগ উঠত। নতুন নিয়মে সেসব বিষয়েও কঠোর নজরদারি থাকবে।
এই নীতিমালার সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার। কারণ পুনঃভর্তি ফি না থাকায় বছরে একবারের বাড়তি চাপ কমবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় খাতে টাকা নেওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।
ধরুন, একটি পরিবারে দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। আগে প্রতি বছর তাদের নতুন করে ভর্তি ফি দিতে হতো। এতে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়ে যেত। এখন সেই চাপটা আর থাকবে না। এই পরিবর্তন অনেক পরিবারের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে আসবে।
এই নীতিমালা শুধু শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বও বাড়িয়েছে। এখন থেকে তাদের আর্থিক কার্যক্রমে আরও সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিটি টাকা কোথা থেকে আসছে, কোথায় খরচ হচ্ছে—সবকিছুর পরিষ্কার হিসাব রাখতে হবে।
এই নিয়মগুলো মানা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে। কারণ সবাই বুঝতে পারবে, এখানে কোনো গোপন লেনদেন বা অপ্রয়োজনীয় খরচ নেই।
এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়লে দুর্নীতি কমবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়বে। আর সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষার্থীরা অযথা আর্থিক চাপ ছাড়াই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে।
একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এমন নীতিমালা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন।
এই নতুন নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের শিক্ষা খাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



