বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬
20.3 C
Jessore
More

    তালিবানের নতুন আইন: হাড় না ভাঙলে মারধর অপরাধ নয়? বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক

    আফগানিস্তানে Taliban শাসনের অধীনে নতুন ফৌজদারি বিধি ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গার্হস্থ্য হিংসা, নারীর স্বাধীনতা এবং দাসপ্রথা সংক্রান্ত বিধান নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরা কঠোর সমালোচনা করছেন। নতুন ‘ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড ফর কোর্টস’ প্রকাশ্যে আসার পর দেখা যাচ্ছে, সেখানে এমন কিছু ধারা যুক্ত হয়েছে যা আধুনিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

    সহজ ভাষায় বললে, নতুন আইনের কিছু অংশ এমন বার্তা দিচ্ছে—ঘরের ভেতরের নির্যাতনকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। আর এটিই এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের কারণ।

    আইনের একটি বিতর্কিত ধারা বলছে, শারীরিক নির্যাতন তখনই অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যখন তাতে হাড় ভাঙবে বা রক্তপাত হবে। অর্থাৎ, কেউ যদি স্ত্রী বা সন্তানকে মারধর করেন কিন্তু দৃশ্যমান গুরুতর আঘাত না লাগে, তাহলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে দেখা নাও হতে পারে।

    ভাবুন তো, একটি পরিবারে প্রতিদিন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চলছে, কিন্তু তা প্রমাণ করার মতো দৃশ্যমান ক্ষত নেই। সেই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

    আইনে আরও বলা হয়েছে, পরিবারের কর্তা বা স্বামী যদি স্ত্রী বা সন্তানকে “শাস্তি” দেন, সেটিকে অপরাধ ধরা হবে না। এমনকি গুরুতর আঘাত প্রমাণিত হলেও সর্বোচ্চ শাস্তি খুবই সামান্য—কখনও মাত্র ১৫ দিনের কারাদণ্ড।

    এই বিধান কার্যত গার্হস্থ্য হিংসাকে সামাজিক স্বীকৃতি দিচ্ছে বলেই অভিযোগ তুলেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

    আরও পড়ুন :  নেপালে ছাত্র-যুব বিদ্রোহের জয়ে সরকারের নতিস্বীকার: সমাজমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

    আফগান নারীদের চলাফেরার ওপর আগেই নানা বিধিনিষেধ জারি রয়েছে। তালিবান শাসনে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা একা বাইরে যেতে পারেন না, পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন হয়। এই বাস্তবতায় আদালতে গিয়ে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা কার্যত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

    নতুন আইনে আরও বলা হয়েছে, বিবাহিত কোনও নারী স্বামীর অনুমতি ছাড়া আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করলে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এই ধারা নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে বড় আঘাত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

    এখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য স্পষ্ট। একজন পুরুষের জন্য যে স্বাধীনতা স্বাভাবিক, একজন নারীর ক্ষেত্রে সেটিই শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হচ্ছে।

    বছরের শুরুতেই জানা যায়, তালিবান শাসিত আফগানিস্তানের এই নতুন কোডে দাসপ্রথা বা ‘গুলামি’ সংক্রান্ত বিধান যুক্ত হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে যেখানে দাসপ্রথা বহু আগেই বাতিল হয়েছে, সেখানে এমন ধারণার আইনি স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

    মানবাধিকার সংস্থা Rawadari দাবি করেছে, ৯০ পাতার এই আইনে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, একই অপরাধ করলেও সবার জন্য শাস্তি এক নয়।

    নতুন আইনে চারটি শ্রেণির কথা উল্লেখ রয়েছে—ধর্মীয় পণ্ডিত, অভিজাত শ্রেণি, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত। অভিযোগ অনুযায়ী, যদি কোনও ধর্মীয় পণ্ডিত অপরাধ করেন, তাঁকে শুধু পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। অভিজাত শ্রেণির ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা বা তলবই যথেষ্ট। কিন্তু একই অপরাধে মধ্যবিত্তের জন্য কারাদণ্ড, আর নিম্নবিত্তের ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক শাস্তির বিধানও থাকতে পারে।

    আরও পড়ুন :  তুরস্কে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা: লিবিয়ার সেনাপ্রধান আল-হাদ্দাদ নিহত, দেশজুড়ে শোক

    এটি কার্যত আইনের চোখে অসমতা তৈরি করছে। আধুনিক বিচারব্যবস্থার মূল নীতি হলো—আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। কিন্তু এখানে সেই নীতি প্রশ্নের মুখে।

    ধরুন, একই ঘটনায় দুই ব্যক্তি জড়িত—একজন প্রভাবশালী, আরেকজন সাধারণ মানুষ। একজন শুধু সতর্কবার্তা পেলে, আর অন্যজন জেলে গেলে—তাহলে সাধারণ মানুষের মনে আইন নিয়ে কী ধারণা তৈরি হবে, সেটা বোঝা কঠিন নয়।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন শুধু আইনি কাঠামো নয়, সামাজিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করবে। গার্হস্থ্য হিংসাকে ন্যূনতম শাস্তিযোগ্য করে তোলা মানে পরিবারে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যকে শক্তিশালী করা।

    নারীর স্বাধীন চলাফেরা, মত প্রকাশ বা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ—এসবকেও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে সমাজে ভয় ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি আরও গভীর হতে পারে।

    এটি কেবল নারীর প্রশ্ন নয়; শিশুদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। পরিবারের কর্তার ‘শাস্তি’ দেওয়ার অধিকার স্বীকৃতি পেলে শিশুরাও নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়ে।

    মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, এই আইন আফগানিস্তানে বৈষম্য, ভয়ভীতি এবং নিপীড়নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। গার্হস্থ্য হিংসা যদি আইনি সুরক্ষা পায়, তাহলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার চাইতে সাহস হারাতে পারেন।

    আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই ধরনের আইন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।

    বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যখন আইনই বৈষম্যকে অনুমোদন দেয়, তখন সমাজে তা স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হতে সময় লাগে না। ধীরে ধীরে মানুষ সেটিকেই নিয়ম বলে মেনে নেয়।

    আরও পড়ুন :  বিশ্বজুড়ে বর্ণিল আয়োজনে ইংরেজি নববর্ষ ২০২৬ উদযাপন: আতশবাজি, উৎসব আর মানুষের উচ্ছ্বাস

    এই আইনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সমাজে যদি দাসপ্রথা, লিঙ্গবৈষম্য এবং শারীরিক শাস্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই কাঠামোর মধ্যে বড় হবে।

    একজন কিশোর যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে, পরিবারের পুরুষ সদস্যের হাতে নির্যাতন বৈধ, তাহলে সে বড় হয়ে কী শিখবে? আবার একজন কিশোরী যদি জানে, তার কথা বলার অধিকার সীমিত—তাহলে তার আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন কতটা সংকুচিত হবে?

    আইন কেবল শাস্তির বিধান নয়; এটি সমাজকে দিকনির্দেশ করে। তাই আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    তালিবানের নতুন ফৌজদারি বিধি নিয়ে বিতর্ক থামছে না। গার্হস্থ্য হিংসার আইনি সংজ্ঞা, নারীর স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং শ্রেণিভিত্তিক শাস্তির বিধান—সব মিলিয়ে এটি মানবাধিকারের প্রশ্নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আইন যদি সমতা ও ন্যায়ের বদলে বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু আদালতঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

    এই কারণেই নতুন আইনকে ঘিরে এত আলোচনা, এত উদ্বেগ। কারণ এটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি নয়, বরং মানবাধিকারের সার্বজনীন ধারণার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।

    লেটেস্ট আপডেট

    খলিলুর রহমান মন্ত্রিসভায় যোগ: “আমি তো জোর করে যাইনি” বিস্ফোরক মন্তব্য

    অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব থেকে নির্বাচনে বিজয়ী দলের মন্ত্রিসভায় যোগ...

    সুখবর! র‍্যাংকিংয়ের ভিত্তিতে ২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টাইগাররা

    সুখবর! র‍্যাংকিংয়ের ভিত্তিতে ২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টাইগাররা। ২০২৮ সালের...

    মব কালচারের দিন শেষ? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি!

    বাংলাদেশে মব কালচারের দিন শেষ—এমন কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা...

    আইনের শাসনই শেষ কথা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কড়া বার্তা

    প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি...

    সেহরি-ইফতারে লোডশেডিং নয়! প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর বার্তা

    নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিশ্রুতি আর...

    বাছাই সংবাদ

    মব কালচারের দিন শেষ? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি!

    বাংলাদেশে মব কালচারের দিন শেষ—এমন কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা...

    আইনের শাসনই শেষ কথা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কড়া বার্তা

    প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি...

    সেহরি-ইফতারে লোডশেডিং নয়! প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর বার্তা

    নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিশ্রুতি আর...

    পুনঃভর্তি ফি বন্ধ! শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন কঠোর সিদ্ধান্তে স্বস্তি শিক্ষার্থীদের

    দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে...

    নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যবিপ্রবি উপাচার্যের অভিনন্দন

    ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর এককভাবে...

    নতুন সরকারের কূটনীতির হাল ধরলেন খলিলুর রহমান ও শামা ওবায়েদ

    বাংলাদেশের নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায়...

    তারেক রহমানের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন! ৫ মন্ত্রণালয় নিজের হাতে, চমকপ্রদ নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণা

    ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৯...

    স্ক্রিন ছাড়া স্মার্ট গ্লাস! Apple-এর গোপন N50 প্রজেক্ট ফাঁস

    প্রযুক্তি দুনিয়ায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে Apple। জানা যাচ্ছে,...

    এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

    জনপ্রিয় ক্যাটাগরি

    Translate »