আফগানিস্তানে Taliban শাসনের অধীনে নতুন ফৌজদারি বিধি ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গার্হস্থ্য হিংসা, নারীর স্বাধীনতা এবং দাসপ্রথা সংক্রান্ত বিধান নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরা কঠোর সমালোচনা করছেন। নতুন ‘ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড ফর কোর্টস’ প্রকাশ্যে আসার পর দেখা যাচ্ছে, সেখানে এমন কিছু ধারা যুক্ত হয়েছে যা আধুনিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সহজ ভাষায় বললে, নতুন আইনের কিছু অংশ এমন বার্তা দিচ্ছে—ঘরের ভেতরের নির্যাতনকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। আর এটিই এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের কারণ।
আইনের একটি বিতর্কিত ধারা বলছে, শারীরিক নির্যাতন তখনই অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যখন তাতে হাড় ভাঙবে বা রক্তপাত হবে। অর্থাৎ, কেউ যদি স্ত্রী বা সন্তানকে মারধর করেন কিন্তু দৃশ্যমান গুরুতর আঘাত না লাগে, তাহলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে দেখা নাও হতে পারে।
ভাবুন তো, একটি পরিবারে প্রতিদিন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চলছে, কিন্তু তা প্রমাণ করার মতো দৃশ্যমান ক্ষত নেই। সেই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
আইনে আরও বলা হয়েছে, পরিবারের কর্তা বা স্বামী যদি স্ত্রী বা সন্তানকে “শাস্তি” দেন, সেটিকে অপরাধ ধরা হবে না। এমনকি গুরুতর আঘাত প্রমাণিত হলেও সর্বোচ্চ শাস্তি খুবই সামান্য—কখনও মাত্র ১৫ দিনের কারাদণ্ড।
এই বিধান কার্যত গার্হস্থ্য হিংসাকে সামাজিক স্বীকৃতি দিচ্ছে বলেই অভিযোগ তুলেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
আফগান নারীদের চলাফেরার ওপর আগেই নানা বিধিনিষেধ জারি রয়েছে। তালিবান শাসনে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা একা বাইরে যেতে পারেন না, পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন হয়। এই বাস্তবতায় আদালতে গিয়ে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা কার্যত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
নতুন আইনে আরও বলা হয়েছে, বিবাহিত কোনও নারী স্বামীর অনুমতি ছাড়া আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করলে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এই ধারা নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে বড় আঘাত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য স্পষ্ট। একজন পুরুষের জন্য যে স্বাধীনতা স্বাভাবিক, একজন নারীর ক্ষেত্রে সেটিই শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হচ্ছে।
বছরের শুরুতেই জানা যায়, তালিবান শাসিত আফগানিস্তানের এই নতুন কোডে দাসপ্রথা বা ‘গুলামি’ সংক্রান্ত বিধান যুক্ত হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে যেখানে দাসপ্রথা বহু আগেই বাতিল হয়েছে, সেখানে এমন ধারণার আইনি স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা Rawadari দাবি করেছে, ৯০ পাতার এই আইনে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, একই অপরাধ করলেও সবার জন্য শাস্তি এক নয়।
নতুন আইনে চারটি শ্রেণির কথা উল্লেখ রয়েছে—ধর্মীয় পণ্ডিত, অভিজাত শ্রেণি, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত। অভিযোগ অনুযায়ী, যদি কোনও ধর্মীয় পণ্ডিত অপরাধ করেন, তাঁকে শুধু পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। অভিজাত শ্রেণির ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা বা তলবই যথেষ্ট। কিন্তু একই অপরাধে মধ্যবিত্তের জন্য কারাদণ্ড, আর নিম্নবিত্তের ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক শাস্তির বিধানও থাকতে পারে।
এটি কার্যত আইনের চোখে অসমতা তৈরি করছে। আধুনিক বিচারব্যবস্থার মূল নীতি হলো—আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। কিন্তু এখানে সেই নীতি প্রশ্নের মুখে।
ধরুন, একই ঘটনায় দুই ব্যক্তি জড়িত—একজন প্রভাবশালী, আরেকজন সাধারণ মানুষ। একজন শুধু সতর্কবার্তা পেলে, আর অন্যজন জেলে গেলে—তাহলে সাধারণ মানুষের মনে আইন নিয়ে কী ধারণা তৈরি হবে, সেটা বোঝা কঠিন নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন শুধু আইনি কাঠামো নয়, সামাজিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করবে। গার্হস্থ্য হিংসাকে ন্যূনতম শাস্তিযোগ্য করে তোলা মানে পরিবারে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যকে শক্তিশালী করা।
নারীর স্বাধীন চলাফেরা, মত প্রকাশ বা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ—এসবকেও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে সমাজে ভয় ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি আরও গভীর হতে পারে।
এটি কেবল নারীর প্রশ্ন নয়; শিশুদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। পরিবারের কর্তার ‘শাস্তি’ দেওয়ার অধিকার স্বীকৃতি পেলে শিশুরাও নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়ে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, এই আইন আফগানিস্তানে বৈষম্য, ভয়ভীতি এবং নিপীড়নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। গার্হস্থ্য হিংসা যদি আইনি সুরক্ষা পায়, তাহলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার চাইতে সাহস হারাতে পারেন।
আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই ধরনের আইন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যখন আইনই বৈষম্যকে অনুমোদন দেয়, তখন সমাজে তা স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হতে সময় লাগে না। ধীরে ধীরে মানুষ সেটিকেই নিয়ম বলে মেনে নেয়।
এই আইনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সমাজে যদি দাসপ্রথা, লিঙ্গবৈষম্য এবং শারীরিক শাস্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই কাঠামোর মধ্যে বড় হবে।
একজন কিশোর যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে, পরিবারের পুরুষ সদস্যের হাতে নির্যাতন বৈধ, তাহলে সে বড় হয়ে কী শিখবে? আবার একজন কিশোরী যদি জানে, তার কথা বলার অধিকার সীমিত—তাহলে তার আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন কতটা সংকুচিত হবে?
আইন কেবল শাস্তির বিধান নয়; এটি সমাজকে দিকনির্দেশ করে। তাই আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তালিবানের নতুন ফৌজদারি বিধি নিয়ে বিতর্ক থামছে না। গার্হস্থ্য হিংসার আইনি সংজ্ঞা, নারীর স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং শ্রেণিভিত্তিক শাস্তির বিধান—সব মিলিয়ে এটি মানবাধিকারের প্রশ্নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আইন যদি সমতা ও ন্যায়ের বদলে বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু আদালতঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
এই কারণেই নতুন আইনকে ঘিরে এত আলোচনা, এত উদ্বেগ। কারণ এটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি নয়, বরং মানবাধিকারের সার্বজনীন ধারণার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।



