বাংলাদেশে মব কালচারের দিন শেষ—এমন কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। তিনি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি আর সহ্য করা হবে না। গণতান্ত্রিক অধিকার থাকবে, কিন্তু সেই অধিকারের আড়ালে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন আরও দৃঢ় অবস্থানে।
মব কালচার বলতে বোঝায়—হঠাৎ করে জনতা একত্রিত হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা বিশৃঙ্খল আচরণ করা। কখনও দাবি আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ, কখনও হঠাৎ বিক্ষোভে ভাঙচুর—এসব পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে।
ভাবুন, আপনি জরুরি কাজে হাসপাতালে যাচ্ছেন। হঠাৎ রাস্তা বন্ধ। কেউ জানে না কতক্ষণ বন্ধ থাকবে। এটাই মব কালচারের বাস্তব চিত্র। এতে শুধু যানজটই হয় না, জননিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, গণতন্ত্রে মিছিল-সমাবেশের অধিকার থাকবে। মানুষ মত প্রকাশ করবে, প্রতিবাদ করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মব তৈরি করে জনজীবন অচল করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। আইন মানতে হবে সবার।
অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন—তাহলে কি আন্দোলন বা প্রতিবাদ বন্ধ হয়ে যাবে? এর জবাবে মন্ত্রী পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চলবে। মিছিল-সমাবেশ করা যাবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। তবে সেই কর্মসূচি যেন জননিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে।
এখানে একটি ভারসাম্য দরকার। একদিকে নাগরিক অধিকার, অন্যদিকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব—শৃঙ্খলা বজায় রাখা। সরকার এখন সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করতে চাইছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানেই শুধু পুলিশ। কিন্তু বাস্তবে এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাধিক সংস্থা কাজ করে, যারা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, মানুষের আস্থা অর্জন করাও বড় দায়িত্ব। অতীতে যদি কোনও কারণে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে, তবে তা পুনরুদ্ধার করতে হবে। পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
আমরা সবাই চাই, বিপদে পড়লে যেন পুলিশকে ভয় না পাই, বরং ভরসা করতে পারি। সেই জায়গায় পৌঁছাতে হলে আচরণ, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব—সবকিছুতেই পরিবর্তন আনতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। তিনি সর্বস্তরে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। কোনও ধরনের অবৈধ তদবির বা প্রভাব খাটানো বরদাশত করা হবে না।
দুর্নীতি যখন কোনও প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ে, তখন সেখানকার কাজের গতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা—দুটোই কমে যায়। তাই শুরুতেই কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। মন্ত্রীর বক্তব্যে বোঝা যায়, তিনি প্রশাসনিক কাঠামোয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চান।
মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বাহিনীর কোনও সদস্য অপরাধে জড়িত থাকলে তাৎক্ষণিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ, দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি নিজেরাই আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। তাই দ্রুত তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাহিনীর ভেতরেও একটি ইতিবাচক বার্তা যায়—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়, বৈঠকে আইজিপিসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না কেন। জবাবে মন্ত্রী জানান, তারা ইতোমধ্যে সাক্ষাৎ করেছেন এবং সম্ভবত অন্য দায়িত্বে ব্যস্ত ছিলেন।
এই বক্তব্যে তিনি পরিষ্কার করেন যে প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়ের কোনও ঘাটতি নেই। দায়িত্বের কারণে কেউ অনুপস্থিত থাকলেও যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রয়েছে।



