আমেরিকার রাজনীতিতে বড় ধাক্কা। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা কোথায়—এই প্রশ্নে সরাসরি হস্তক্ষেপ করল যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিল, জাতীয় জরুরি অবস্থার অজুহাত দেখিয়ে একক সিদ্ধান্তে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বিশাল শুল্ক বসানো যায় না। এভাবে শুল্ক আরোপ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।
এই রায় শুধু একটি অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। এটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমেরিকার ঘাটতি কমাতে এবং দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে কঠোর শুল্কনীতি চালু করেন। তিনি ১৯৭৭ সালের আইন—ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট বা IEEPA—ব্যবহার করে জাতীয় জরুরি অবস্থার যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি ছিল, বিদেশি পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ আমেরিকার অর্থনীতির জন্য হুমকি।
কিন্তু প্রশ্ন উঠল, এই আইনের আওতায় কি প্রেসিডেন্ট একাই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? সংবিধান অনুযায়ী আমদানি-রপ্তানি ও কর-শুল্ক সংক্রান্ত ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের হাতে। সেই জায়গাতেই আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
প্রধান বিচারপতি John Roberts-এর নেতৃত্বে নয় বিচারপতির বেঞ্চ ৬-৩ ভোটে রায় দেয়। আদালত জানায়, IEEPA প্রেসিডেন্টকে এমন ক্ষমতা দেয় না, যার মাধ্যমে তিনি কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া একতরফাভাবে আমদানি শুল্ক আরোপ করতে পারেন।
আদালত পরিষ্কার করে বলেছে, কোন দেশ থেকে কোন পণ্যে কত শতাংশ শুল্ক বসবে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা কংগ্রেসের। প্রেসিডেন্ট জরুরি পরিস্থিতিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন, কিন্তু তা সীমাহীন নয়।
সহজভাবে ভাবলে বিষয়টা এমন—আপনি যদি একটি পরিবারের খরচ চালানোর দায়িত্ব পান, তাহলে হঠাৎ করে সবার সঙ্গে আলোচনা না করে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে ফেলতে পারেন না। একইভাবে, দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে হলে কংগ্রেসকে পাশ কাটানো যায় না।
Donald Trump-এর প্রশাসন এই শুল্কনীতির মাধ্যমে আগামী দশ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, IEEPA-এর আওতায় ইতোমধ্যে প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় হয়েছে।
এখন আদালতের রায়ের পর সেই অর্থের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের ফেরত দিতে হতে পারে। ফলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে—এটা প্রায় নিশ্চিত।
এই রায় শুধু আমেরিকার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির একটি। তাদের শুল্কনীতি বদলালে বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যে নড়াচড়া শুরু হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা বরাবরই উচ্চ শুল্কের বিরোধী। আদালতের রায়কে তারা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে।
এই রায়ের বড় দিক হলো—এটি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোতে তিনটি প্রধান স্তম্ভ আছে—প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এবং বিচার বিভাগ। কেউ এককভাবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নন।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট দেখিয়ে দিল, অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রেও সাংবিধানিক নিয়ম মানতেই হবে। জরুরি অবস্থা থাকলেও সেটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কংগ্রেসকে উপেক্ষা করা যাবে না।
এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টদের জন্যও এক ধরনের সতর্কবার্তা। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বা কঠোর বাণিজ্যনীতি নিতে চাইলে আইনগত ভিত্তি শক্ত হতে হবে।
যেসব ব্যবসায়ী অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন, তারা এই রায়ে স্বস্তি পেয়েছেন। অনেক আমদানিকারক বলছেন, হঠাৎ শুল্ক বৃদ্ধি তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এলোমেলো করে দেয়। কাঁচামালের দাম বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়ে, শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ পড়ে।
এখন যদি সরকারকে সেই অর্থ ফেরত দিতে হয়, তাহলে তা প্রশাসনের জন্য বড় আর্থিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিটি দাবি যাচাই করা, হিসাব মিলানো—সবই সময়সাপেক্ষ।
এই রায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও আলোচনা তুঙ্গে। বিরোধী শিবির বলছে, এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর জয়। অন্যদিকে ট্রাম্পপন্থীরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক কৌশলে বাধা দেওয়া হয়েছে।
তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, তারা রাজনৈতিক নয়—সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইন যেটা বলেছে, রায়ও সেটাই মেনে দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন, এরপর কী? কংগ্রেস চাইলে নতুন আইন প্রণয়ন করে প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট পরিসরে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিতে পারে। আবার প্রশাসন বিকল্প আইনি পথও খুঁজতে পারে।
কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—একক সিদ্ধান্তে বিশাল আন্তর্জাতিক শুল্ক আরোপের পথ আপাতত বন্ধ। অর্থাৎ বাণিজ্যনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। এটি দেখিয়ে দিল, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ক্ষমতা কখনও এক হাতে কেন্দ্রীভূত হয় না।
জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক কৌশল—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান ও আইনের শাসন। সুপ্রিম কোর্ট সেই বার্তাই আবার মনে করিয়ে দিল।
এখন সবার নজর কংগ্রেস ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ এই সিদ্ধান্ত শুধু অতীতের নীতি নিয়ে নয়—ভবিষ্যতের বাণিজ্য কৌশলও অনেকটাই নির্ধারণ করে দেবে।



