সুপার এইটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভারতের হার শুধু একটা পরাজয় নয়, বরং কৌশল আর নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের এক স্পষ্ট উদাহরণ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৮৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারত মাত্র ১১১ রানে গুটিয়ে যায়। ৭৬ রানের বড় ব্যবধানে এই হার অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তবে এই ম্যাচের পর আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এক অপ্রত্যাশিত নাম— ডোয়েন ব্র্যাভো।
দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার লুঙ্গি এনগিডি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর বোলিংয়ের সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে ব্র্যাভোর। বিশেষ করে স্লোয়ার বলের কৌশল আয়ত্ত করতে ব্র্যাভোর পরামর্শ তাঁকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
ম্যাচের শুরুতেই বোঝা যাচ্ছিল, পিচে রান করা সহজ হবে না। তবু ১৮৮ রান তাড়া করতে নেমে ভারতীয় ব্যাটারদের কাছ থেকে অনেক বেশি প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত বোলিং পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পাওয়ারপ্লে থেকে শুরু করে মাঝের ওভার— সব জায়গাতেই ভারত চাপে পড়ে। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে। বড় শট খেলতে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় কয়েকজন ব্যাটার। ফলে ম্যাচ থেকে ধীরে ধীরে ছিটকে যায় মেন ইন ব্লু।
এই ম্যাচে চার ওভারে মাত্র ১৫ রান দেন এনগিডি। টি-টোয়েন্টির মতো ফরম্যাটে যেখানে ব্যাটাররা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক, সেখানে ওভার প্রতি মাত্র ৩.৭৫ রান দেওয়া সত্যিই বিরল ঘটনা। উইকেট না পেলেও তাঁর বোলিংয়ের প্রভাব ছিল স্পষ্ট।
ভারতীয় ব্যাটাররা তাঁর স্লোয়ার বল বুঝতেই পারেননি। কখন স্লো ইয়র্কার, কখন ব্যাক অফ লেংথ, আবার কখন স্লো বাউন্সার— এই বৈচিত্র্য পুরো ছন্দ নষ্ট করে দেয়।
ভাবুন তো, আপনি যদি দ্রুতগতির বলের জন্য প্রস্তুত থাকেন আর হঠাৎ গতি কমে যায়, তখন টাইমিং মিলবে কীভাবে? ঠিক সেই অবস্থাতেই পড়েছিল ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপ।
এনগিডি জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের আইপিএলে তিনি খুব বেশি সুযোগ পাননি। তবে সেই সময় ব্র্যাভোর সঙ্গে অনুশীলন করার সুযোগ হয়েছিল। নেট প্র্যাকটিসে ব্র্যাভোর কাছ থেকেই তিনি স্লোয়ার বলের সূক্ষ্ম দিকগুলো শিখেছেন।
ব্র্যাভো নিজেও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে স্লোয়ার বলের জন্য বিখ্যাত। ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা তাঁর অসাধারণ। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনগিডি নিজের বোলিংয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
তিনি বলেছেন, স্লো ইয়র্কার, ব্যাক অফ লেংথ এবং স্লো বাউন্সার— এই তিন ধরনের ডেলিভারিতে ভ্যারিয়েশন আনার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন। শুধু গতি কমালেই হয় না, হাতের ভঙ্গি, রিলিজ পয়েন্ট, এমনকি শরীরের মুভমেন্টও একই রাখতে হয়। তবেই ব্যাটার বুঝতে পারে না আসলে কী আসছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক এডেন মার্করাম ম্যাচ শেষে এনগিডির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, এনগিডি নিজেও জানেন না তাঁর হাতে কতটা জাদু লুকিয়ে আছে।
মার্করাম বলেন, পাওয়ারপ্লেতে এনগিডির নিয়ন্ত্রিত বোলিং ম্যাচের ভিত গড়ে দেয়। মাঝের ওভারগুলোতেও দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। তিন ধরনের স্লোয়ার বল দেওয়ার দক্ষতা বিশ্ব ক্রিকেটে খুব কম পেসারের আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই ম্যাচে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে— শুধু আগ্রাসী ব্যাটিং দিয়ে সব সময় জেতা যায় না। পরিকল্পনা, ধৈর্য আর সঠিক কৌশল অনেক সময় বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
ভারতীয় ব্যাটাররা হয়তো দ্রুত রান তুলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের ফাঁদে ফেলেছে নিখুঁতভাবে। স্লোয়ার বলের ভ্যারিয়েশন এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে ব্যাটাররা নিজেদের খেলাই খেলতে পারেননি।
ক্রিকেটে অনেক সময় ছোট ছোট কৌশলই বড় ফল দেয়। এনগিডির বোলিং তার জীবন্ত প্রমাণ।
আইপিএলের মতো টুর্নামেন্টে বিশ্বের সেরা ক্রিকেটাররা একসঙ্গে খেলেন। সেখানে শেখার সুযোগও থাকে অনেক। এনগিডির ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
ব্র্যাভোর মতো অভিজ্ঞ টি-টোয়েন্টি বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে শেখা কৌশল আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রয়োগ করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, শেখার প্রক্রিয়া কখনও বৃথা যায় না। আইপিএলে কম সুযোগ পেলেও সেই সময়ের অনুশীলনই আজ তাঁর বড় সম্পদ।
ভারতের জন্য এই হার অবশ্যই হতাশার। তবে একই সঙ্গে এটা শেখার সুযোগও। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শুধু শক্তি নয়, বুদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা দেখিয়ে দিয়েছে, পরিকল্পিত বোলিং আর সঠিক এক্সিকিউশন থাকলে যে কোনও শক্তিশালী দলকেও চাপে ফেলা যায়।
সব মিলিয়ে, এই ম্যাচ শুধু স্কোরবোর্ডের লড়াই ছিল না। এটা ছিল কৌশল, অভিজ্ঞতা আর সঠিক প্রস্তুতির জয়। আর সেই জয়ের নেপথ্যে একদিকে যেমন এনগিডির নিখুঁত স্লোয়ার বোলিং, তেমনই পর্দার আড়ালে থেকে প্রভাব ফেলেছেন ডোয়েন ব্র্যাভো।
ক্রিকেটপ্রেমীরা হয়তো এবার নতুন করে বুঝলেন— একজন মেন্টরের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে। মাঠে খেলেন একজন, কিন্তু সাফল্যের গল্পে জড়িয়ে থাকেন আরও অনেকেই।


