ফুটবলের দুনিয়ায় এমন সাফল্য খুব কম মানুষই পেয়েছেন, যা পেয়েছেন Lionel Messi। একের পর এক ব্যালন ডি’অর, ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য ট্রফি, আর দেশের হয়ে বিশ্বকাপ—সব মিলিয়ে যেন পূর্ণতা পাওয়া এক ক্যারিয়ার। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, এই মানুষটার জীবনে আর পাওয়ার কিছু বাকি নেই।
কিন্তু জানেন তো, যত বড় মানুষই হোক, ভেতরে ভেতরে কিছু না কিছু আফসোস থাকেই। মেসিও তার ব্যতিক্রম নন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, জীবনের একটা বড় সুযোগ তিনি নষ্ট করেছেন। আর সেই আক্ষেপ আজও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।
ইংরেজি না শেখার আক্ষেপ: কেন নিজেকে ‘অজ্ঞ’ মনে হয়?
একটি মেক্সিকান পডকাস্টে কথা বলতে গিয়ে মেসি খুব খোলামেলা ভাবে জানান, তিনি ইংরেজি শেখেননি—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় আফসোস।
ভাবুন তো, বিশ্বের প্রায় সব বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান, মিডিয়া ইন্টারভিউ, স্পনসর ইভেন্ট—সব জায়গাতেই ইংরেজির ব্যবহার বেশি। সেখানে দাঁড়িয়ে যদি নিজের ভাবনা নিজের ভাষায় বলতে না পারেন, কেমন লাগবে?
মেসি বলেন, তাঁর হাতে সময় ছিল। সুযোগও ছিল। কিন্তু তিনি সেটা কাজে লাগাননি। এখন যখন তিনি বিশ্বের নানা দেশের মানুষের সঙ্গে দেখা করেন, কথা বলেন, তখন মনে হয়—“আমি পারলে আরও ভালোভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারতাম।”
এই জায়গাতেই তিনি নিজেকে ‘অজ্ঞ’ মনে করেন। এত সাফল্যের পরেও ভাষা না জানার এই সীমাবদ্ধতা তাঁকে কষ্ট দেয়।
পড়াশোনা বনাম ফুটবল: ছোটবেলার মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত
মেসি আর্জেন্টিনায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু তখনই তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার দ্রুত এগোতে শুরু করে।
প্রথমে Newell’s Old Boys ক্লাবে তাঁর হাতেখড়ি। সেখান থেকে সুযোগ আসে ইউরোপের বড় মঞ্চে—FC Barcelona-তে।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি রোজারিও ছেড়ে স্পেনে পাড়ি দেন। এই বয়সটা সাধারণত পড়াশোনা, বন্ধু, স্কুলজীবনের স্মৃতি গড়ার সময়। কিন্তু মেসির জীবন তখন অন্য রাস্তায় হাঁটছে।
তিনি জানতেন, তাঁর সামনে বড় সুযোগ অপেক্ষা করছে। তাই ফুটবলকেই বেছে নেন। আর তারপর? বাকিটা তো ইতিহাস।
তবে এখানেই একটা বিষয় রয়ে গেছে। ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে তিনি ভাষা শেখার সুযোগ পেলেও গুরুত্ব দেননি। আজ সেই সময়টার কথা ভাবলেই আফসোস হয় তাঁর।
সন্তানদের জন্য অন্য বার্তা
মজার বিষয় হলো, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন মেসি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, তাঁর সন্তানদের তিনি সব সময় পড়াশোনার গুরুত্ব বোঝান।
তিনি ওদের বলেন, “সুযোগকে হেলাফেলা কোরো না। সময় নষ্ট কোরো না।”
দেখুন, একজন মানুষ যখন নিজের ভুল স্বীকার করে, তখন সেটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে ওঠে। মেসি চান না, তাঁর সন্তানেরা একই ভুল করুক।
তিনি বলেন, ভালো শিক্ষা, প্রস্তুতি, নিজেকে তৈরি করা—এসব জীবনের জন্য খুব প্রয়োজন। শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না, নিজেকে সবদিক দিয়ে গড়ে তুলতে হয়।
বিশ্বকাপের লক্ষ্য: আবারও সেরা হওয়ার স্বপ্ন
সব আক্ষেপ সত্ত্বেও মেসির চোখ এখন সামনে। তিনি অতীতে আটকে নেই। তাঁর লক্ষ্য নতুন করে বিশ্বকাপে ঝাঁপিয়ে পড়া।
গতবারের বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি এখনো টাটকা। FIFA World Cup-এ আর্জেন্টিনার হয়ে ট্রফি তোলা তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।
এবার তাঁর লক্ষ্য সেই সাফল্য ধরে রাখা।
ভাবুন তো, এত কিছু পাওয়ার পরেও একজন মানুষ এখনও নতুন স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামেন। এখানেই মেসির আলাদা হয়ে ওঠা।
সাফল্যের আড়ালের মানুষটা
আমরা অনেক সময় শুধু ট্রফি দেখি, গোল দেখি, রেকর্ড দেখি। কিন্তু একজন মানুষের ভেতরের লড়াইটা দেখি না।
মেসির এই স্বীকারোক্তি দেখিয়ে দেয়, সাফল্য মানেই নিখুঁত জীবন নয়। বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে করতালির মাঝেও একজন মানুষ নিজের ভুল নিয়ে ভাবতে পারেন, অনুতাপ করতে পারেন।
আর এই স্বীকারোক্তিই তাঁকে আরও মানবিক করে তোলে।
ভাবুন তো, আপনি যদি জীবনে বড় কিছু পান, তবু মনে হয়—“আহা, যদি এই কাজটা করতাম!”—ঠিক সেই অনুভূতিই মেসিরও আছে।
শিক্ষা যা সবার জন্য
এই গল্প শুধু একজন ফুটবলারের নয়। এটা আমাদের সবার গল্প।
অনেক সময় আমরা ভাবি, “এই কাজটা পরে করব।”
“সময় তো আছেই।”
“এখন না শিখলেও চলবে।”
কিন্তু সময় খুব দ্রুত চলে যায়। পরে ফিরে তাকালে আফসোস হয়।
মেসির মতো একজন কিংবদন্তিও যখন বলেন, তিনি সময় নষ্ট করেছেন—তখন সেটা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।
ভাষা শেখা, নতুন কিছু শেখা, নিজেকে উন্নত করা—এসব কখনোই ছোট বিষয় নয়। আপনি জানেন না, ভবিষ্যতে কোন দক্ষতা কখন দরকার পড়ে যাবে।
শেষ কথা
Lionel Messi হয়তো ফুটবলে প্রায় সবই পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর এই ছোট্ট আক্ষেপ আমাদের বড় একটা শিক্ষা দিয়ে যায়।
সাফল্যের শীর্ষে থেকেও তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন। নিজের ভুল মেনে নেন। আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেন।
হয়তো এটাই আসল মহত্ত্ব।
ট্রফি আর রেকর্ডের বাইরে, একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে উন্নত করার ইচ্ছাই তাঁকে আরও বড় করে তোলে।



