নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি বাংলাদেশ। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরুতে বেশ বিতর্ক তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত বিসিবিকে কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি। বরং পরিস্থিতি এমনভাবে ঘুরেছে যে, বিশ্বকাপের পরপরই একাধিক শক্তিশালী দলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলার সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক—বিশ্বকাপ বয়কটের পরও কীভাবে এত বড় বড় সিরিজের দরজা খুলে গেল?
চলুন সহজ করে পুরো বিষয়টা বুঝে নিই।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি—এটা নিঃসন্দেহে বড় সিদ্ধান্ত। সাধারণভাবে এমন ঘটনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল কঠোর অবস্থান নিতে পারত। কিন্তু আইসিসি সে পথে হাঁটেনি। বরং তারা বিষয়টিকে সংবেদনশীলভাবে দেখেছে।
আইসিসির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা সংযোগ গুপ্ত প্রকাশ্যে বলেছেন, পূর্ণ সদস্য কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হোক—এটা তারা চান না। এক কথায়, বাংলাদেশকে শাস্তি দিয়ে কোণঠাসা না করে বরং ক্রিকেটের স্বার্থেই পাশে দাঁড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে সংস্থা।
ভাবুন তো, বিশ্বকাপে না খেলায় আর্থিক ক্ষতি তো হয়েছেই। এর ওপর যদি বড় অঙ্কের জরিমানা বা নিষেধাজ্ঞা আসত, তাহলে বাংলাদেশের ক্রিকেট কাঠামোই নড়বড়ে হয়ে যেত। আইসিসি সেটা বুঝেছে বলেই হয়তো সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে।
আগেই নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ। এই সিরিজ থেকে বিসিবির উল্লেখযোগ্য আর্থিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ পাকিস্তান-বাংলাদেশ ম্যাচ মানেই টিভি সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন আর দর্শক আগ্রহ—সব মিলিয়ে বড় আয়োজন।
এই সিরিজ শুধু ক্রিকেটীয় দিক থেকে নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে এখান থেকেই।
বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। প্রোটিয়াদের মাটিতে দুটি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই দুটি টেস্ট বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সিরিজ নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের বড় প্রতিযোগিতার অংশ।
দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে খেলা সবসময়ই কঠিন। বাউন্স, গতি, সিম মুভমেন্ট—সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশ। কিন্তু বড় দলকে তাদের ঘরের মাঠে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগই তো উন্নতির আসল পরীক্ষা। বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য এটা দারুণ অভিজ্ঞতা হবে।
এরপর আরও বড় খবর। ২৩ বছর পর বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজ খেলতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০৩ সালের পর এই প্রথমবার অজিদের মাটিতে টেস্ট সিরিজ আয়োজন করা হচ্ছে বাংলাদেশের বিপক্ষে।
Australia national cricket team বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল। তাদের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলা মানেই কঠিন লড়াই। এখানেও দুটি টেস্ট ম্যাচ থাকবে, যেগুলো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ।
এটা শুধু সিরিজ নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে বড় অধ্যায়। কারণ অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের বিপক্ষে নিয়মিত সিরিজ পাওয়া মানেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে গুরুত্ব পাওয়া।
এখন মূল প্রশ্নে আসা যাক—আইসিসি কেন বাংলাদেশকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছে?
প্রথমত, বাংলাদেশ পূর্ণ সদস্য দেশ। দ্বিতীয়ত, এখানে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বিশাল। প্রায় ২০ কোটির বেশি মানুষের দেশ, আর ক্রিকেট এখানে আবেগের নাম। স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক, টিভির সামনে লাখো মানুষ—এটা বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য বড় বাজার।
যদি বাংলাদেশ ক্রিকেট আর্থিক বা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে বিশ্ব ক্রিকেটের সামগ্রিক বাজারও ছোট হয়ে যাবে। ক্রিকেট এখনো হাতে গোনা কয়েকটি দেশে জনপ্রিয়। সেই তালিকা থেকে যদি বাংলাদেশ পিছিয়ে যায়, ক্ষতি সবার।
আইসিসি তাই বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শাস্তি নয়, সহযোগিতা—এই নীতিতেই তারা এগিয়েছে।
একটা বিষয় খেয়াল করুন। বড় দলের সঙ্গে সিরিজ মানেই সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি—সব মিলিয়ে বিশাল অর্থপ্রবাহ। দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে সিরিজ বিসিবির কোষাগার শক্ত করবে।
শুধু টাকা নয়, কৌশলগত দিক থেকেও লাভ আছে। বড় দলের বিপক্ষে খেললে র্যাঙ্কিং উন্নত হয়, অভিজ্ঞতা বাড়ে, খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য এটা যেন বড় স্কুলে পড়ার মতো—চ্যালেঞ্জ আছে, কিন্তু শেখার সুযোগও অসীম।
বাংলাদেশে ক্রিকেট মানে উৎসব। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের ক্যাফে—সব জায়গায় ম্যাচ নিয়ে আলোচনা চলে। এই বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীই আসলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
আইসিসি সেটা জানে। তারা বোঝে, বাংলাদেশ ক্রিকেট সচল থাকলে বিশ্ব ক্রিকেটও লাভবান হবে। তাই সাময়িক এক বিতর্কের কারণে স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনার বদলে তারা দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিশ্বকাপ বয়কটের পর যে ঝড় উঠেছিল, সেটি ধীরে ধীরে থেমে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া—একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সিরিজ বাংলাদেশের সামনে বড় পরীক্ষা।
এখন দায়িত্ব ক্রিকেটারদের। মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই প্রমাণ করতে হবে, এই সুযোগ তারা প্রাপ্য। বড় দলের বিপক্ষে লড়াইয়ে ভালো ফল আনতে পারলে সমালোচনার জায়গা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে।
শেষ কথা হলো, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সম্পর্ক, অর্থনীতি আর দর্শক—এই তিনটি বিষয় একে অন্যের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ সেই সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বিশ্বকাপ না খেলেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের গুরুত্ব একটুও কমেনি—বরং নতুন বাস্তবতায় তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।



