টি-২০ বিশ্বকাপ মানেই অঙ্ক, হিসাব আর প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে বদলে যাওয়া সমীকরণ। একদিন সব ঠিকঠাক, পরের দিনই সব উলটে যেতে পারে। ঠিক এমন সময়েই সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার দাপুটে জয় যেন ভারতের জন্য একটু স্বস্তির হাওয়া হয়ে এল। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে সেমিফাইনালের দরজায় কড়া নাড়ল প্রোটিয়ারা। আর সেই সঙ্গে ভারতের পথও অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেল।
সুপার এইটের প্রথম ম্যাচে হারের পর চাপটা বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছিল ভারত। পয়েন্ট টেবিলের হিসাব তখন খুব একটা সহজ ছিল না। এমন অবস্থায় দক্ষিণ আফ্রিকার জয় ভারতের জন্য ছিল ভীষণ দরকারি। কারণ প্রোটিয়ারা যত জিতবে, ভারতের সামনে সমীকরণ তত সহজ হবে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সেটাই বাস্তবে দেখা গেল। আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা দেখিয়ে দিল তারা কেন এই টুর্নামেন্টে এখনও অপরাজেয়।
টস জিতে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক এডেন মার্করাম ক্যারিবীয়দের ব্যাট করতে পাঠান। শুরুটা কিন্তু ভয় ধরানোই ছিল। প্রথম ওভারেই ১৭ রান তুলে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মনে হচ্ছিল বড় স্কোর আসতে পারে।
কিন্তু এই আত্মবিশ্বাস বেশিক্ষণ টেকেনি। লুনগি এনগিডির নেতৃত্বে প্রোটিয়া বোলাররা খুব দ্রুত ম্যাচের রাশ হাতে নিয়ে নেন। তৃতীয় ওভার থেকেই একের পর এক উইকেট পড়তে শুরু করে। মাত্র ১০ ওভারের মধ্যেই সাতজন ব্যাটার ফিরে যান প্যাভিলিয়নে। সেই সময় স্কোরবোর্ডের দিকে তাকালে বোঝাই যাচ্ছিল, বিপদে পড়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও দুইজন দাঁড়িয়ে লড়াই করেন। জেসন হোল্ডার আর রোমারিও শেফার্ড। হোল্ডারের অভিজ্ঞতা আর শেফার্ডের শক্তিশালী শট মিলিয়ে ধীরে ধীরে স্কোরটা ভদ্রস্থ জায়গায় নিয়ে যান তারা।
শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ থামে ১৭৬ রানে। টি-২০ ক্রিকেটে স্কোরটা খারাপ নয়, কিন্তু এই পিচে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনের সামনে খুব একটা নিরাপদও ছিল না। এটা অনেকটা এমন, যেমন পরীক্ষায় পাশ নম্বর পেলেও টপ করার আশা করা যায় না।
১৭৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন প্রোটিয়া ব্যাটাররা। ওপেনিংয়ে নেমে অধিনায়ক এডেন মার্করামের সঙ্গে ঝড় তোলেন কুইন্টন ডি’কক। ডি’কক মাত্র ২৪ বলে ৪৭ রান করেন। প্রতিটি শটেই ছিল আত্মবিশ্বাস আর আগ্রাসন।
গুডাকেশ মোতিদের বোলিংকে যেন রীতিমতো অনুশীলনের বল মনে হচ্ছিল। ডি’কক আউট হলেও রানের গতি এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যায়নি।
তিন নম্বরে নামা রায়ান রিকলটন কিছুটা সময় নিলেও অধিনায়ক মার্করাম ছিলেন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। তিনি একদিকে উইকেট বাঁচিয়ে খেলেছেন, অন্যদিকে প্রয়োজনমতো বাউন্ডারিও বের করেছেন।
অপরাজিত ৮২ রানের ইনিংসে মার্করাম বুঝিয়ে দিলেন কেন তাঁকে দলের ভরসার জায়গা বলা হয়। তাঁর এই ইনিংসেই ৯ উইকেট হাতে রেখেই ম্যাচ জিতে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। সেমিফাইনাল এখন তাদের হাতের মুঠোয় বললেও ভুল হয় না।
এখন প্রশ্ন হল, এই ম্যাচে ভারতের লাভটা কোথায়। ব্যাপারটা খুব সোজা। দক্ষিণ আফ্রিকা যত এগোবে, ততই ভারতের জন্য জায়গা তৈরি হবে পয়েন্ট টেবিলে।
এই ম্যাচের ঘণ্টাখানেক পরেই ভারতের মুখোমুখি হওয়ার কথা জিম্বাবোয়ের। সেই ম্যাচে বড় ব্যবধানে জিততে পারলেই ভারতের সেমিফাইনালের সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাবে। মানে, হিসাবটা আর কাগজ-কলমে আটকে থাকবে না, বাস্তবেই রূপ নেবে।
আহমেদাবাদে হেরে গেলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ এখনও পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তবে এই জায়গাটা একদমই নিরাপদ নয়। বৃহস্পতিবার রাতে ভারত যদি বড় ব্যবধানে জেতে, তাহলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসবে ভারত।
সেক্ষেত্রে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হবে জিম্বাবোয়েকে। আর তখন ইডেন গার্ডেন্সে ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচটা হয়ে উঠবে কার্যত কোয়ার্টার ফাইনাল। ওই ম্যাচে হার মানেই বিদায়, জিতলেই সেমিফাইনাল।
সব মিলিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপ এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি ম্যাচ মানেই ফাইনালের মতো চাপ। দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের কাজটা দারুণভাবে করে ফেলেছে। ভারত এখন সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারবে কি না, সেটাই দেখার।
ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এটা দারুণ সময়। কারণ প্রতিটি বল, প্রতিটি রান বদলে দিচ্ছে ছবিটা। আর ঠিক এই অনিশ্চয়তাই টি-২০ ক্রিকেটকে এতটা রোমাঞ্চকর করে তোলে।



