চেন্নাইয়ের চিপক স্টেডিয়ামে কঠিন পরীক্ষায় দারুণভাবে উত্তীর্ণ হলো টিম ইন্ডিয়া। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ৭২ রানের জয়ে সুপার এইটের লড়াইয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পেল সূর্যকুমার যাদবদের দল। তবে গল্প এখানেই শেষ নয়—ভারতের বিশ্বকাপ যাত্রা এখন ঝুলে আছে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের উপর।
এই ম্যাচে ভারত জিতলেও সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। কারণ, পরের ম্যাচেই ঠিক হবে ‘মেন ইন ব্লু’ সেমিফাইনালে উঠবে, নাকি এখানেই থামতে হবে তাদের স্বপ্নযাত্রা।
ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল ভারত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে। কোচ গৌতম গম্ভীরের তত্ত্বাবধানে দলকে শুরু থেকেই ফেভারিট ধরা হচ্ছিল। কিন্তু সুপার এইটের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে সমীকরণ কঠিন হয়ে যায়।
চেন্নাইয়ের ম্যাচ তাই ছিল কার্যত ‘করো বা মরো’। এই চাপের মধ্যেই জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে মাঠে নামে ভারত। লক্ষ্য ছিল শুধু জয় নয়, বড় ব্যবধানে জয়। সেই কাজটাই দারুণভাবে করে দেখালেন হার্দিক পাণ্ডিয়ারা।
ভারত নির্ধারিত ২০ ওভারে তোলে ২৫৬/৪—যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় শুরুতেই। জবাবে জিম্বাবোয়ে থামে ১৮৪/৬-এ। ফলে ৭২ রানের বড় জয়ে স্বস্তি পায় ভারতীয় শিবির।
এই ম্যাচে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে অভিষেক শর্মার ব্যাটিং। সাম্প্রতিক সময়ে অফ-ফর্মে থাকা এই তরুণ ওপেনার অসুস্থতা কাটিয়ে ফিরে এলেন নিজের চেনা ছন্দে।
তিনি খেলেন ঝকঝকে ৫৫ রানের ইনিংস। চারটি বাউন্ডারি এবং চারটি ছক্কায় সাজানো এই ইনিংস ভারতের ইনিংসকে শক্ত ভিত দেয়।
অনেকে বলতে পারেন, প্রতিপক্ষ তুলনামূলক দুর্বল ছিল। কিন্তু টানা ব্যর্থতার পর যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে অভিষেক পুল ও সুইপ খেলেছেন, তা পরের ম্যাচের আগে দলের জন্য বড় ইতিবাচক দিক। সহজ করে বললে—ব্যাটে আবার প্রাণ ফিরেছে।
এই ম্যাচে দলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। রিঙ্কুর বদলি হিসেবে সুযোগ পান সঞ্জু স্যামসন। তাঁকে ওপেনিংয়ে নামিয়ে অফস্পিনের বিরুদ্ধে দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা করে টিম ম্যানেজমেন্ট।
এই কৌশল আংশিক সফলও হয়েছে। ওপেনিং জুটি দ্রুত রান তুলে চাপ কমিয়ে দেয় মিডল অর্ডারের উপর। বড় ম্যাচের আগে এই পরীক্ষা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
মাঝের ওভারগুলোতে ভারতের গতি আরও বাড়িয়ে দেন তিলক বর্মা। আগে কিছুটা ধীর ব্যাটিংয়ের জন্য সমালোচনায় ছিলেন তিনি। কিন্তু এদিন সেই খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসেন।
মাত্র ১৬ বলে অপরাজিত ৪৪ রান করে তিনি ম্যাচের গতি পুরো বদলে দেন। তাঁর এই আগ্রাসী ইনিংস শেষের দিকে রান রেট আকাশছোঁয়া করে তোলে।
সহজ ভাষায় বললে, শেষের দিকে তিলক এমনভাবে গিয়ার বদলান, যেন গাড়ি হঠাৎ টার্বো মোডে চলে গেছে।
দলের সহ-অধিনায়ক হার্দিক পাণ্ডিয়াও এদিন নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেন। তিনি অপরাজিত অর্ধশতরান করে বুঝিয়ে দেন—চাপের ম্যাচে এখনও তিনি বড় ভরসা।
তার ইনিংস ছিল পরিণত ও হিসেবি। শুরুতে সময় নিয়ে পরে বড় শট—একেবারে ক্লাসিক ফিনিশারের ভূমিকা। গ্যালারিতে বসে তাঁর ইনিংস উপভোগ করেন তাঁর ঘনিষ্ঠজন মাহিকা, যা ম্যাচে আলাদা আবেগ যোগ করে।
যদিও ম্যাচ হেরেছে জিম্বাবোয়ে, তবুও তাদের সফর একেবারেই ম্লান নয়। বিশেষ করে ব্রায়ান বেনেটের অপরাজিত ৯৭ রান চেন্নাইয়ের দর্শকরা অনেকদিন মনে রাখবেন।
চাপের মধ্যে তিনি একাই লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৬টি ছক্কা। দলের বাকিরা বড় রান করতে না পারলেও বেনেট শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছেন।
ক্রিকেটে অনেক সময় হারলেও কিছু ইনিংস স্মরণীয় হয়ে থাকে—বেনেটের এই ইনিংস ঠিক তেমনই।
ভারতের বোলিং বিভাগে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন অর্শদীপ সিং। তিনি চার ওভারে মাত্র ২৪ রান দিয়ে তুলে নেন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট।
জিম্বাবোয়ের মিডল অর্ডারে ধস নামানোর মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। এছাড়া একটি করে উইকেট পান বরুণ চক্রবর্তী, শিবম দুবে এবং অক্ষর প্যাটেল।
তবে একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা থাকছেই। ম্যাচ প্রায় নিশ্চিত হওয়ার পরও শেষ ওভারে শিবম দুবে একাধিক ওয়াইড দেন। বড় ম্যাচে এই ধরনের ভুল বিপদ ডেকে আনতে পারে—এটা টিম ম্যানেজমেন্ট নিশ্চয়ই মাথায় রাখবে।
চেন্নাইয়ে জয়ের ফলে ভারতের রাস্তা কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কাজ এখনও বাকি। কারণ সামনে অপেক্ষা করছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনাল।
এই ম্যাচটাই আসল ফয়সালা করবে। যে দল জিতবে, সে পৌঁছে যাবে সেমিফাইনালে। হারলেই বিদায়।
অর্থাৎ, এত বড় জয়ের পরও ভারত পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। ইডেন গার্ডেন্সে রবিবারের ম্যাচটাই এখন সূর্যবাহিনীর জন্য আসল অগ্নিপরীক্ষা।
ভারতীয় ব্যাটিং লাইন-আপ এখন ছন্দে ফিরছে—এটা বড় ইতিবাচক দিক। কিন্তু বোলিংয়ে কিছু জায়গায় শৃঙ্খলার ঘাটতি চোখে পড়েছে।

বিশেষ করে ডেথ ওভারের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে হবে। কারণ ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ছোট ভুলও ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে।
এক কথায়, চেন্নাইয়ে ভারত আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু আসল পরীক্ষা এখনও বাকি।
চিপকে দাপুটে জয়ে টিম ইন্ডিয়া আবারও লড়াইয়ে ফিরেছে। অভিষেকের ফর্মে ফেরা, তিলকের ঝড়ো ইনিংস আর হার্দিকের দায়িত্বশীল ব্যাটিং—সব মিলিয়ে দলের আত্মবিশ্বাস এখন অনেকটাই চাঙ্গা।
তবুও বিশ্বকাপের রাস্তা এখনও কঠিন। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সেই লেখা হবে সূর্যবাহিনীর ভবিষ্যৎ—সেমিফাইনালের টিকিট নাকি অকাল বিদায়।
ক্রিকেটভক্তদের চোখ এখন একটাই ম্যাচে। রবিবারের লড়াই বলবে—ভারত ইন, না আউট।



