টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শক্ত বার্তা দিল ভারত। চেন্নাইয়ে জিম্বাবোয়েকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল সূর্যকুমার যাদবের দল। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আধিপত্য দেখিয়ে ভারত বুঝিয়ে দিল, সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার দৌড়ে তারা কতটা সিরিয়াস।
এর মধ্যেই সামনে বড় পরীক্ষা। রবিবার কলকাতার ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ম্যাচটি কার্যত কোয়ার্টার ফাইনাল। যে দল জিতবে, সেই দলই পৌঁছে যাবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। তাই জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে এই জয় ভারতের জন্য মানসিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
ম্যাচের আগে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। টপ অর্ডারের সমস্যা কাটাতে দলে ফেরানো হয় সঞ্জু স্যামসনকে। অভিষেক শর্মার সঙ্গে ওপেন করতে নামেন তিনি। আর এই বদলেই ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়।
অনেক দিন পর ওপেনিং জুটিতে স্বস্তির রান পায় ভারত। ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশনের সুবিধা কাজে লাগে শুরু থেকেই। জিম্বাবোয়ের অধিনায়ক সিকন্দর রাজা প্রথম ওভারে অফ স্পিন না এনে পেস আক্রমণ চালু করেন—আর সেখানেই ভারত সুযোগ লুফে নেয়।
সঞ্জু শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলেন। বলের গতি ব্যবহার করে দ্রুত রান তোলেন তিনি। অন্যদিকে, অভিষেক একটু সময় নিয়ে চোখ সেট করেন। সঞ্জু মাত্র ১৫ বলে ২৪ রান করে আউট হলেও দলের ভিত মজবুত করে দেন। চার ওভারের মধ্যেই ভারত পঞ্চাশ পার করে ফেলে।
এই ম্যাচে অবশেষে ব্যাটে ছন্দে ফিরলেন অভিষেক শর্মা। পাওয়ার প্লে দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে তিনি ইনিংস গড়েন। ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে নিয়মিত বাউন্ডারি মারতে থাকেন।
২৬ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৩০ বলে ৫৫ রান করে আউট হন, যেখানে ছিল চারটি চার ও চারটি ছক্কা। স্কোরবোর্ডে রান এলেও তার ব্যাটিংয়ে একটু চাপের ছাপ স্পষ্ট ছিল। কয়েকটি শটে টাইমিং মিস করেন তিনি।
তবে এই ইনিংস নিঃসন্দেহে স্বস্তি দেবে টিম ম্যানেজমেন্টকে, বিশেষ করে কোচ গৌতম গম্ভীরকে। বড় ম্যাচের আগে ওপেনারের ফর্মে ফেরা সব সময়ই ভালো খবর।
এই ম্যাচে ভারতের প্রায় সব ব্যাটারই দ্রুত রান তোলেন। ঈশান কিশন খেলেন ২৪ বলে ৩৮ রানের ঝরঝরে ইনিংস। অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব মাত্র ১৩ বলে করেন ৩৩ রান।
তবে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় হার্দিক পাণ্ড্য ও তিলক বর্মার জুটি। তিন নম্বরে তিলক ঠিকমতো রান পাচ্ছিলেন না। কিন্তু ছয় নম্বরে নেমে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজে খেলেন। শুরু থেকেই আক্রমণ চালান।
হার্দিক ও তিলকের মধ্যে মাত্র ৩১ বলে ৮৪ রানের বিধ্বংসী জুটি গড়ে ওঠে। ইনিংসের শেষ দুই বলে পরপর ছক্কা মেরে হার্দিক ২৩ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন। তিলক ১৬ বলে ৪৪ রানে অপরাজিত থাকেন।
ফলাফল—২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ২৫৬। চলতি বিশ্বকাপে এটিই সর্বোচ্চ দলগত রান। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর, আর টি-টোয়েন্টিতে ভারতের সর্বোচ্চ রানও বটে।
২৫৭ রানের লক্ষ্য যে পাহাড়সম, তা শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। তবু নজর ছিল—জিম্বাবোয়ে কীভাবে রান তাড়া শুরু করে।
কিন্তু পাওয়ার প্লে-তেই তারা ম্যাচ থেকে কার্যত ছিটকে যায়। প্রথম ছয় ওভারে উইকেট না পড়লেও রান তোলার গতি ছিল খুব ধীর। ফলে প্রয়োজনীয় রানরেট দ্রুত বেড়ে যায়।
পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে তাদিওয়ানাশে মারুমানির একটি ক্যাচ ফেলেন রিঙ্কু সিং। কঠিন ক্যাচ ধরতে অভ্যস্ত রিঙ্কুর এমন ভুল কিছুটা বিস্ময়ই জাগায়।
শেষ পর্যন্ত জিম্বাবোয়েকে প্রথম ধাক্কা দেন অক্ষর পটেল। স্পেলের দ্বিতীয় বলেই মারুমানিকে আউট করেন তিনি। আবারও প্রমাণ হয়, আগের ম্যাচে তাকে না খেলানো বড় ভুল ছিল।
বরুণ চক্রবর্তীও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিয়ন মায়ার্সকে আউট করেন। তবু লড়াই ছাড়েননি ব্রায়ান বেনেট ও সিকন্দর রাজা। দু’জনেই বড় শট খেলে ম্যাচে থাকার চেষ্টা করেন।
বেনেট দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ৩৪ বলে অর্ধশতরান করেন—চলতি বিশ্বকাপে এটি তার তৃতীয় ফিফটি।
ম্যাচ প্রায় ভারতের মুঠোয় থাকলেও একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাঁচ বোলার থাকা সত্ত্বেও অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব বল তুলে দেন শিবম দুবের হাতে।
শিবমের একটি ওভারেই ২৬ রান ওঠে। পরে আরেক ওভারেও তিনি প্রচুর রান দেন। দুই ওভারে মোট ৪৬ রান খরচ করেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত না নিলে ভারতের জয়ের ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।
জয় প্রায় অসম্ভব জেনেও লড়াই চালিয়ে যান বেনেট ও সিকন্দর। বড় শট খেলে রান তোলার চেষ্টা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অর্শদীপ সিং এসে জুটি ভাঙেন।
তিনি সিকন্দরকে ৩১ রানে ফেরান এবং একই ওভারে রায়ান বার্লকে শূন্যতে আউট করেন। বেনেট শতরানের খুব কাছে পৌঁছেও থামেন ৯৭ রানে অপরাজিত থেকে।
জিম্বাবোয়ের ইনিংস শেষ হয় ৬ উইকেটে ১৮৪ রানে। ভারত জেতে ৭২ রানের বড় ব্যবধানে।
স্কোরলাইন যত বড়ই হোক, ভারতের বোলিং নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে শেষের দিকে যেভাবে জিম্বাবোয়ের ব্যাটাররা বড় শট খেলেছে, তা চিন্তায় রাখবে টিম ম্যানেজমেন্টকে।
কারণ সামনে অপেক্ষা করছে শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কলকাতার ইডেনে সেই ম্যাচই নির্ধারণ করবে—ভারত যাবে সেমিফাইনালে, নাকি থেমে যাবে এখানেই।
এক কথায়, ব্যাটিংয়ে ঝড় তুললেও বোলিংয়ে আরও শান দিতে হবে সূর্যকুমারদের। বড় ম্যাচের আগে এটাই ভারতের সবচেয়ে বড় হোমওয়ার্ক।



