মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির সম্পৃক্ততার কারণে পুরো অঞ্চল এখন অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কানাডা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি না—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে চাননি দেশটির প্রধানমন্ত্রী Mark Carney।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক অভিযানের নাটকীয় ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে ইরানের ওপর পরিচালিত ভয়াবহ বিমান হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল এবং সবচেয়ে নিখুঁত আকাশ অভিযানগুলোর একটি।
অস্ট্রেলিয়ায় কূটনৈতিক সফরে থাকা অবস্থায় সাংবাদিকরা কানাডার প্রধানমন্ত্রী Mark Carney-কে প্রশ্ন করেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতে কানাডা কি সেনা পাঠাবে? উত্তরে তিনি সরাসরি “হ্যাঁ” বা “না” বলেননি।
তার ভাষায়, কোনো পরিস্থিতিতে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, কানাডা সব সময় তার মিত্র দেশগুলোর পাশে দাঁড়াবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে কানাডা কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকিতেও যেতে চাইছে না।
মার্কিন সেনাবাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কমান্ড United States Central Command সম্প্রতি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আকাশ থেকে হামলার দৃশ্য।
এই অভিযানকে বলা হচ্ছে Operation Epic Fury।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই অভিযানের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী একাধিক হামলা চালানো হয়েছে। তাদের ভাষায়, এটি “ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী, সবচেয়ে জটিল এবং সবচেয়ে নির্ভুল আকাশ অভিযান।”
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং উন্নত যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে কুর্দি বাহিনীর সম্পৃক্ততার খবরে।
ফক্স নিউজের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সাংবাদিক Jennifer Griffin দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করার পর কুর্দি যোদ্ধারা ইরানের ভেতরে অবস্থান নিতে শুরু করেছে।
খবরে বলা হয়েছে, তারা পশ্চিম ইরানের মারিভান এলাকার দক্ষিণ পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেখানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্ভবত ইরানের ভেতরে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ সৃষ্টি করতে চাইছে। আর সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই কুর্দি যোদ্ধাদের সংগঠিত করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আরেকটি ঘটনা।
খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনীর চার থেকে সাতটি হেলিকপ্টার ইরাকের নাজাফ মরুভূমিতে অবতরণ করে। সেখানে আকাশপথে কিছু সামরিক সরঞ্জাম ফেলা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
যদিও এ বিষয়ে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সরঞ্জামগুলো হয়তো আঞ্চলিক মিত্র বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লেবাননভিত্তিক সংগঠন Hezbollah-এর ভূমিকা।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তারা পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটির প্রধান Naim Qassem এক বক্তব্যে বলেছেন, তারা কোনো পরিস্থিতিতেই আত্মসমর্পণ করবে না।
তার ভাষায়, “আমরা আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়েছি। আমাদের পথ হলো প্রতিরোধ। প্রয়োজনে শেষ ত্যাগ স্বীকার করেও আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট Joseph Aoun হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন।
তিনি বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এটি একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
তবে বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ হিজবুল্লাহ শুধু একটি সামরিক সংগঠন নয়, বরং লেবাননের রাজনীতিতেও তাদের বড় প্রভাব রয়েছে।
যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক পালিয়ে যাচ্ছেন।
অনেক মার্কিন নাগরিক বিশেষ চার্টার বিমানে করে অঞ্চল ছেড়ে গেছেন। বিভিন্ন দূতাবাসও তাদের নাগরিকদের দ্রুত দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ যে অনেক পরিবার রাতারাতি সবকিছু ফেলে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়েছে বিমানবন্দরেও।
ওমানের রাজধানী Muscat থেকে ব্রিটিশ নাগরিকদের দেশে ফেরাতে একটি চার্টার ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়েও বিমানটি উড়তে পারেনি।
যাত্রীরা দীর্ঘ সময় বিমানের ভেতরে বসে ছিলেন। অনেকেই আতঙ্কে জানালায় ধাক্কা দিতে শুরু করেন, কেউ কেউ আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
একজন যাত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল হয়ে গিয়েছিল।
তার কথায়, প্রথমে বাসে করে তাদের বিমান পর্যন্ত নেওয়া হয়। এরপর প্রায় দেড় ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয় বিমানের ভেতরে। কিন্তু সেখানে কোনো কনস্যুলার কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না।

এই অবস্থায় অনেক যাত্রী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, পাইলটের কাজের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ায় বিমানটি উড়তে পারেনি।
বিমান চলাচলের নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের বেশি দায়িত্ব পালন করলে পাইলটদের বিশ্রাম নিতে হয়। নিরাপত্তার স্বার্থেই এই নিয়ম কঠোরভাবে মানা হয়।
তবে অনেক যাত্রী প্রশ্ন তুলেছেন—যখন অন্য বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলো উড়তে পারছে, তখন এই চার্টার ফ্লাইট কেন উড়তে পারল না।
বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত খুব দ্রুত থামার সম্ভাবনা কম।
ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন শক্তির স্বার্থ এখানে জড়িত। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
কানাডার মতো দেশগুলো আপাতত সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু যদি সংঘাত আরও বড় আকার নেয়, তাহলে পশ্চিমা জোটের অনেক দেশকেই সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে।
এই মুহূর্তে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে—কারণ এখানকার একটি সিদ্ধান্তই হয়তো বদলে দিতে পারে বৈশ্বিক রাজনীতির পুরো সমীকরণ।


