খেলোয়াড় থেকে সংগঠক: যশোরের ক্রীড়া ইতিহাসে এ জেড এম সালেকের অবদান

যশোরের ক্রীড়া ইতিহাসে যাঁদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন এ জেড এম সালেক। এক সময় মাঠ কাঁপানো খেলোয়াড়, পরে সফল সংগঠক—দুই ভূমিকাতেই তিনি রেখে গেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। খেলাধুলা, সংগঠন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন এক বহুমাত্রিক অনুপ্রেরণার গল্প।

১৯৫৭ সালের ৫ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন এ জেড এম সালেক। তাঁর পরিবার ছিল যশোরের একটি সুপরিচিত পরিবার। তাঁর পিতা কেনায়েত আলী ছিলেন একজন খ্যাতনামা আইনজীবী এবং সমাজসেবী। তিনি যশোর আইনজীবী সমিতি-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি যশোর ঈদগাহ ময়দান-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

তাঁদের পারিবারিক বাসভবন যশোর শহরের খড়কি এলাকার শাহ আব্দুল করিম সড়কে অবস্থিত। আর তাঁদের গ্রামের বাড়ি যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার আজ মেহেরপুর গ্রামে।

এই পরিবেশেই বড় হয়েছেন সালেক, যেখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধ—সবকিছুরই শক্ত ভিত্তি ছিল।

শৈশব থেকেই এ জেড এম সালেক ছিলেন মেধাবী ও খেলাধুলাপ্রিয়। তিনি পড়াশোনা করেন ঐতিহ্যবাহী যশোর জিলা স্কুল-এ।

১৯৭৩ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ড থেকে এসএসসি পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন এবং মেধাতালিকায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। এই ফলাফল তাঁর অধ্যবসায় এবং অসাধারণ মেধার প্রমাণ দেয়।

তবে শুধু পড়াশোনাতেই নয়, খেলাধুলাতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। স্কুলজীবনেই ফুটবল, হকি, বাস্কেটবল এবং অ্যাথলেটিকস—এই চারটি খেলাতেই তাঁর অসাধারণ দক্ষতা দেখা যায়।

স্কুলে পড়ার সময়ই সালেক মাঠে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিতে শুরু করেন। তখন তিনি প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে আসাদ স্মৃতি সংঘ-এর হয়ে খেলেন। অল্প বয়সেই বড়দের লিগে খেলার সুযোগ পাওয়া তাঁর দক্ষতারই প্রমাণ।

আন্তঃস্কুল ফুটবল ও হকি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। বিশেষ করে হকিতে তিনি বাংলাদেশ পর্যায়ে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন, যা তাঁর ক্রীড়া জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।

পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন মাইকেল মধুসূদন কলেজ-এ। কলেজজীবনেও তাঁর ক্রীড়া প্রতিভা আরও বিকশিত হয়।

আন্তঃবোর্ড ও আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় ফুটবল, হকি ও অ্যাথলেটিকস দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় কলেজের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে তিনি যশোর জেলা হকি দল-এর খেলোয়াড় হিসেবেও জেলার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে খেলেন।

ফুটবল ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় খেলা। যশোরের বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে তিনি প্রথম বিভাগ ফুটবল খেলেছেন। সেই তালিকাটা বেশ বড়।

তিনি খেলেছেন কিশোর ক্লাব, যুব একাদশ, কালেক্টরেট ক্লাব, যশোর স্পোর্টিং, অগ্রণী সংঘ, সৌখিন ক্রীড়াচক্র, টাউন ক্লাব, আসাদ স্মৃতি সংঘ এবং প্রভাতী স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে।

ভাবুন তো—একজন খেলোয়াড় এক শহরের এতগুলো ক্লাবের হয়ে মাঠে নামছেন। এটা সম্ভব হয়েছে তাঁর প্রতিভা, পরিশ্রম এবং খেলাধুলার প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে।

সক্রিয় ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার পর অনেকেই খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যান। কিন্তু এ জেড এম সালেক সেভাবে থেমে থাকেননি।

খেলা ছেড়ে দিলেও তিনি ক্রীড়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লং টেনিস খেলায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। ফলে মাঠের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনোই বিচ্ছিন্ন হয়নি।

খেলোয়াড় থেকে সংগঠক—এই পরিবর্তনটাও তিনি সফলভাবে করেছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা-এর সাধারণ সম্পাদকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাঁর নেতৃত্বে যশোরের ক্রীড়া সংগঠনে নতুন গতি আসে। স্থানীয় খেলোয়াড়দের সুযোগ তৈরি করা, প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ক্রীড়া লেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন থেকে তিনি “শ্রেষ্ঠ ক্রীড়া সংগঠক” সম্মাননায় ভূষিত হন।

শুধু যশোরেই নয়, বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়া সংগঠনেও তিনি কাজ করেছেন।

তিনি খুলনা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা-এর যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশন-এর সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন।

একই সঙ্গে তিনি যশোর ক্লাব-এর কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই সব কাজের মাধ্যমে তিনি ক্রীড়া প্রশাসনের ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতা ও নেতৃত্বের প্রমাণ দিয়েছেন।

খেলাধুলা আর সংগঠনের বাইরেও সমাজসেবায় তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়।

তিনি রোটারি ক্লাব অব যশোর-এর সাবেক সভাপতি। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন মানবিক ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন।

বর্তমানে তিনি যশোর জেলা স্কুল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

এছাড়া বাঘারপাড়া নাগরিক কল্যাণ সমিতি এবং রোটারি কেনায়েত আলী আনোয়ারা খাতুন ওল্ডহোমসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন।

সব মিলিয়ে এ জেড এম সালেক-এর জীবন এক অসাধারণ উদাহরণ। একজন মানুষ কীভাবে একই সঙ্গে মেধাবী ছাত্র, সফল খেলোয়াড়, দক্ষ সংগঠক এবং সমাজসেবী হতে পারেন—তার বাস্তব প্রমাণ তিনি।

যশোরের ক্রীড়া ইতিহাসে তাঁর অবদান শুধু স্মরণীয়ই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন যেন বলে—মাঠে যেমন লড়াই করতে হয়, তেমনি সমাজের জন্যও কাজ করতে হয়। আর সেই কাজটাই তিনি করে যাচ্ছেন নীরবে, নিষ্ঠার সঙ্গে।

লেটেস্ট আপডেট

উদীচী হত্যাযজ্ঞের ২৭ বছর: বিচারের অপেক্ষায় আজও মুখোশধারী ঘাতকরা

যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘাতকেরা শনাক্ত হলো না।...

“আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেন”- যশোরে অপহৃত বাবার জন্য ছোট্ট হৃদার কান্না

অপহৃত স্বামীর সন্ধান দাবিতে সংবাদ সম্মেলনে কাঁদছিলেন স্ত্রী রেশমা...

যশোরে ‘চালডাল’ সংকটের অবসান: বকেয়া বেতন ইস্যুতে সমঝোতা, কাজে ফিরলেন কর্মীরা

যশোরের ই-কমার্স খাতে গত কয়েকদিন ধরে চলমান ‘চালডাল’ কর্মীদের...

যশোরে বড় সিদ্ধান্ত: ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ব্যবহার অর্ধেকে নামানোর ঘোষণা

যশোরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে...

কারা পাচ্ছেন স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬? তালিকায় খালেদা জিয়াসহ অনেক বিশিষ্ট নাম

বাংলাদেশ সরকার জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য...

বাছাই সংবাদ

উদীচী হত্যাযজ্ঞের ২৭ বছর: বিচারের অপেক্ষায় আজও মুখোশধারী ঘাতকরা

যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘাতকেরা শনাক্ত হলো না।...

“আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেন”- যশোরে অপহৃত বাবার জন্য ছোট্ট হৃদার কান্না

অপহৃত স্বামীর সন্ধান দাবিতে সংবাদ সম্মেলনে কাঁদছিলেন স্ত্রী রেশমা...

কারা পাচ্ছেন স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬? তালিকায় খালেদা জিয়াসহ অনেক বিশিষ্ট নাম

বাংলাদেশ সরকার জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য...

সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় আনিস আলমগীরের জামিন মঞ্জুর করল হাইকোর্ট

বাংলাদেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে আলোচিত একটি ঘটনায় অবশেষে স্বস্তির খবর...

ক্লাস্টার বোমা নিয়ে নতুন উত্তেজনা! ইরানকে ঘিরে ইজরায়েলের গুরুতর অভিযোগ

পশ্চিম এশিয়ার চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন এক বিতর্কের জন্ম...

দুবাইয়ে ড্রোন হামলা, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার নির্দেশ আমেরিকার, আকাশজুড়ে মিসাইল আতঙ্ক

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিদিন...

ভারত মহাসাগরে বড় সংঘর্ষ! মার্কিন টর্পেডোতে ডুবল ইরানের যুদ্ধজাহাজ- নিহত ৮৭

বিশ্ব রাজনীতির উত্তেজনা নতুন মোড় নিল যখন ভারত মহাসাগরের...

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি