ক্রিকেটে অনেক সময় এমন মুহূর্ত আসে যখন একজন খেলোয়াড় ফর্মে থাকেন না, কিন্তু দল ও সতীর্থরা তার পাশে দাঁড়ায়। ঠিক এমনটাই দেখা গেল ভারতীয় দলের ভেতরে। বিশ্বকাপে রান না পেলেও ওপেনার অভিষেক শর্মার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ালেন সঞ্জু স্যামসন। সেমিফাইনালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করা সঞ্জু বিশ্বাস করেন, বড় মঞ্চে অভিষেকই হতে পারেন ভারতের অন্যতম নায়ক।
ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ভারত যখন বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে, তখন দলের ভেতরের বন্ধুত্ব, আস্থা এবং ইতিবাচক পরিবেশ নতুন করে সামনে এসেছে। ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে সঞ্জু শুধু নিজের পারফরম্যান্স নয়, দলের প্রতিটি সদস্যের অবদান এবং বিশেষ করে অভিষেকের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী কথা বলেন।
মুম্বইয়ের ঐতিহাসিক ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেমিফাইনাল ম্যাচে ভারত ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। বড় স্কোর গড়ার পরও ভারতকে শেষ পর্যন্ত কঠিন লড়াই করতে হয়েছে।
এই ম্যাচে ব্যাট হাতে সঞ্জু স্যামসন গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে তিনি দলের রান দ্রুত বাড়াতে সাহায্য করেন। তার আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং ভারতের ইনিংসে গতি এনে দেয় এবং দলের স্কোরকে শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দেয়।
ম্যাচ শেষে সঞ্জু বলেন, দলের পরিবেশ এখন অসাধারণ। সবাই আনন্দ নিয়ে খেলছে এবং একে অপরকে সমর্থন করছে। তার মতে, এই ইতিবাচক পরিবেশই দলের সাফল্যের বড় কারণ।
বিশ্বকাপ জুড়ে অভিষেক শর্মা খুব বেশি রান করতে পারেননি। সেমিফাইনাল ম্যাচেও তার ব্যাট থেকে বড় ইনিংস আসেনি। কিন্তু তাতে দলের ভেতরে কোনো হতাশা নেই।
সঞ্জু পরিষ্কার করে বলেন, অভিষেকের ওপর দলের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তার মতে, ক্রিকেটে কখনও কখনও এমন সময় আসে যখন ভালো খেলোয়াড়ও রান পান না। কিন্তু সেই সময়টা সাময়িক।
তিনি বলেন, “আমরা কেউই অভিষেককে নিয়ে চিন্তিত নই। দলের পরিবেশ খুব ভালো। সবাই একে অপরকে সমর্থন করছে। আমরা বিশ্বাস করি, ফাইনাল ম্যাচটাই হতে পারে অভিষেকের ম্যাচ।”
এই মন্তব্য শুধু একজন সতীর্থের প্রতি সমর্থনই নয়, বরং দলের শক্ত বন্ধুত্বেরও প্রতিফলন।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে সঞ্জু নিজেও খুব একটা ভালো ফর্মে ছিলেন না। কিন্তু টুর্নামেন্ট চলাকালীন তিনি ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ ফিরে পান।
তিনি জানান, আগের সিরিজে তিনি অনেক সময় শক্তি দিয়ে শট খেলতে যাচ্ছিলেন, যার ফলে সমস্যা হচ্ছিল। পরে তিনি নিজের ব্যাটিং স্টাইল কিছুটা বদলান এবং টাইমিংয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন।
সঞ্জু বলেন, “এখন আমি বলের টাইমিংয়ের দিকে বেশি মন দিচ্ছি। ফলে ব্যাটে বল খুব ভালো লাগছে এবং শট খেলতেও স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছি।”
তার মতে, ব্যাটিংয়ে এই ছোট পরিবর্তনই তাকে আবার আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
সেমিফাইনাল ম্যাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল যখন অভিষেক শর্মা আগেই অনুমান করেছিলেন যে এই পিচে অন্তত ২৫০ রান করতে হবে।
সঞ্জু বলেন, অভিষেকই প্রথম তাকে বলেছিলেন এই উইকেটে বড় স্কোর দরকার। কারণ ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বড় রান তাড়া করা কঠিন নয়।
অভিষেক আউট হওয়ার পর সঞ্জু এবং ঈশান দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করেন। পরে তিলক ভার্মা এবং হার্দিক পাণ্ডিয়াও একইভাবে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান।
এই পরিকল্পিত ব্যাটিংই শেষ পর্যন্ত ভারতের স্কোরকে শক্ত জায়গায় নিয়ে যায়।
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম এমন একটি মাঠ যেখানে প্রায়ই বড় রান তাড়া করা যায়। তাই শুধু বড় স্কোর করলেই ম্যাচ জেতা নিশ্চিত নয়।
সঞ্জু বলেন, “আমরা জানতাম এই মাঠে যে কোনো দল বড় রান তাড়া করতে পারে। তাই যত বেশি সম্ভব রান করার চেষ্টা করেছি।”
ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ম্যাচে ভালো লড়াই করেছিল এবং একসময় জয়ের কাছাকাছিও পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতের বোলাররা শেষ পর্যন্ত ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন।
ম্যাচ জয়ের কৃতিত্ব দিতে গিয়ে সঞ্জু বিশেষভাবে প্রশংসা করেন ভারতের বোলিং আক্রমণকে। বিশেষ করে জসপ্রীত বুমরাহের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ।
তিনি বলেন, “বুমরাহ যেভাবে বল করেছে তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এমন বোলার লাখে একজন পাওয়া যায়।”
সঞ্জুর মতে, ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার বুমরাহ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। কারণ তার চার ওভারই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
যখন মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ড ম্যাচ জিতে যাবে, তখন বুমরাহের নিখুঁত বোলিং রান তোলার গতি কমিয়ে দেয় এবং ভারতকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে।
শুধু বুমরাহ নয়, পাওয়ার প্লেতে বরুণের বোলিংও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতেই প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের চাপে ফেলে দেন তিনি।
এই চাপের কারণেই ইংল্যান্ড পরে দ্রুত রান তুলতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যায়।
সঞ্জু বলেন, ক্রিকেটে অনেক সময় ছোট ছোট অবদানই বড় ফল এনে দেয়। এই ম্যাচেও ঠিক সেটাই হয়েছে।
ম্যাচ চলাকালীন ভারত বুমরাহ এবং হার্দিক পাণ্ডিয়ার ওভার আগে শেষ করে দেয়। এর পেছনে ছিল একটি নির্দিষ্ট কৌশল।
সঞ্জু জানান, দল চেয়েছিল ম্যাচটি যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে। তাই গুরুত্বপূর্ণ বোলারদের আগেই ব্যবহার করা হয়।
এই পরিকল্পনার ফলে ইংল্যান্ডের রান তোলার গতি মাঝপথেই কমে যায় এবং শেষ ওভারে শিবমের ওপর খুব বেশি চাপ থাকেনি।
সেমিফাইনালে সঞ্জু স্যামসন দারুণ ইনিংস খেললেও শতরান করতে পারেননি। পরপর দুই ম্যাচে শতরানের কাছাকাছি গিয়েও তিনি সেই মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেননি।
তবে এই বিষয়টি তাকে মোটেও হতাশ করেনি।
তিনি বলেন, টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে দলের প্রয়োজনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
“আমি কখনও শতরানের কথা ভাবিনি। আমার লক্ষ্য ছিল যত বেশি সম্ভব রান করা, যাতে দল শক্ত অবস্থানে যেতে পারে,” বলেন সঞ্জু।
এই মানসিকতাই একজন প্রকৃত দলীয় খেলোয়াড়ের পরিচয় দেয়।
প্রতিটি ক্রিকেটারেরই স্বপ্ন থাকে দেশের হয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা। সঞ্জু স্যামসনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা নয়।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন ভারতের হয়ে বড় মঞ্চে খেলবেন। এবার সেই স্বপ্ন বাস্তব হতে চলেছে।
রবিবারের ফাইনাল ম্যাচ তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় মুহূর্ত হতে পারে।
সঞ্জুর বিশ্বাস, দল যদি একই আত্মবিশ্বাস এবং দলীয় ঐক্য ধরে রাখতে পারে, তাহলে ভারত বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
ভারতের বিশ্বকাপ অভিযানে শুধু পারফরম্যান্স নয়, দলের ভেতরের বিশ্বাস এবং বন্ধুত্বও বড় ভূমিকা রাখছে। সঞ্জু স্যামসনের কথায় পরিষ্কার বোঝা যায়, একজন খেলোয়াড় খারাপ সময়ের মধ্যে থাকলেও দল তাকে কখনও একা ফেলে দেয় না।
ফাইনালের আগে এই ঐক্যই ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।
এখন সবার চোখ রবিবারের সেই মহারণের দিকে। সঞ্জুর বিশ্বাস সত্যি হলে, বিশ্বকাপ ফাইনালই হতে পারে অভিষেক শর্মার জীবনের সেরা ম্যাচ। আর সেই ম্যাচই হয়তো ভারতের জন্য এনে দিতে পারে আরেকটি বিশ্বকাপের গৌরব।



