মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এমন একটি মন্তব্য করেছেন যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন সে সিদ্ধান্তে তারও ভূমিকা থাকা উচিত। এমনকি তিনি সরাসরি বলেছেন যে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর ছেলে মোজতবা খামেনেইকে তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।
এই মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং কূটনৈতিক দিক থেকেও বেশ বিস্ফোরক। কারণ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন মূলত একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে বাইরের কোনো দেশের হস্তক্ষেপকে অধিকাংশ ইরানি নাগরিক অপমানজনক বলে মনে করেন।
একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, মোজতবা খামেনেই নেতৃত্বের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী নন। তার মতে, ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এমন একজনের হাতে থাকা উচিত যিনি দেশটিতে স্থিতিশীলতা ও শান্তি আনতে পারবেন।
তিনি আরও দাবি করেন, যদি মোজতবা খামেনেই সর্বোচ্চ নেতা হন, তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
ট্রাম্প নিজের আগের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এবং সেখানকার নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব ছিল। সেই উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চান যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় শক্তিগুলোর প্রভাব অনেক সময় নির্ধারক হয়ে ওঠে।
মোজতবা খামেনেই ইরানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর ছেলে এবং দেশটির শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের (IRGC) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়।
ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে তার প্রভাব অনেক। তাই যখনই খামেনেইর উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা হয়, তখনই মোজতবার নাম সামনে আসে।
তবে তার নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কও কম নয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তাকে ক্ষমতায় বসানো হলে ইরানে এক ধরনের পারিবারিক ক্ষমতার ধারাবাহিকতা তৈরি হবে, যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন। তার ভূমিকা অনেকটা ধর্মীয় প্রধানের মতো। অনেকেই এটাকে ক্যাথলিক চার্চের পোপের সঙ্গে তুলনা করেন।
সর্বোচ্চ নেতা দেশের সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং বড় বড় নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখেন। তাই নতুন নেতা নির্বাচন শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেও পড়ে।
এ কারণেই বাইরের কোনো শক্তি যদি এ বিষয়ে মতামত দেয়, তা দ্রুত আন্তর্জাতিক বিতর্কে পরিণত হয়।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে বলে খবর এসেছে। তেহরানের দাবি, এসব হামলায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটি হাজার হাজার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইসরায়েল, মার্কিন ঘাঁটি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থাপনার দিকে।
এই সংঘাতের ফলে পুরো অঞ্চলেই অস্থিরতা বেড়ে গেছে। অনেক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইরান সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। ফলে এর প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে।
মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ৮২ ডলারের বেশি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব দেখা গেছে। এক রাতের মধ্যেই গ্যাসের দাম ১১ সেন্ট বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের পর এটিই সবচেয়ে বড় একদিনের মূল্যবৃদ্ধি।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কুর্দি যোদ্ধাদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ করছে।
কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার কুর্দি যোদ্ধা ইতিমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে অভিযানে অংশ নিতে শুরু করেছে। যদি এটি সত্যি হয়, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে।
মজার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে যে তাদের লক্ষ্য ইরানে সরকার পরিবর্তন নয়। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ঠেকানো।
হোয়াইট হাউস চারটি প্রধান লক্ষ্য তুলে ধরেছে:
প্রথমত, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করা।
দ্বিতীয়ত, দেশটির নৌবাহিনী দুর্বল করা।
তৃতীয়ত, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
চতুর্থত, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে দেওয়া।
তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বাস্তবে এসব পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকেই নাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রথম দিকে ট্রাম্প বলেছিলেন এই সংঘাত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে। কিন্তু পরে তিনি নিজেই সতর্ক করেছেন যে যুদ্ধ “অনেক দীর্ঘ” সময় ধরে চলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অবশ্য বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে চায় না। তার মতে, লক্ষ্য স্পষ্ট—ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশল তুলনামূলকভাবে সরল। তারা চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করতে।
যদি হামলার ফলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি বা মানবিক বিপর্যয় ঘটে, তাহলে সেই দেশগুলোই যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থামানোর জন্য চাপ দিতে পারে।
এই কৌশল অনেকটা দাবার মতো—প্রতিটি চালের লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে দুর্বল করা।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন, সেটি শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়—এর প্রভাব পুরো বিশ্বের ওপর পড়তে পারে।
ট্রাম্পের মতো একজন প্রভাবশালী নেতার মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন সবাই অপেক্ষা করছে ইরান শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই সংঘাত কোন দিকে গড়ায়।
একটা বিষয় পরিষ্কার—এই অঞ্চলের রাজনীতি অনেকটা আগ্নেয়গিরির মতো। বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও ভেতরে সব সময়ই চাপ জমে থাকে। আর যখন সেটা বিস্ফোরিত হয়, তখন তার প্রভাব পুরো পৃথিবী অনুভব করে।


