ক্রিকেট কখনো কখনো এমন গল্প লিখে, যা সিনেমার চেয়েও বেশি নাটকীয় মনে হয়। রবিবার সন্ধ্যায় ঠিক তেমনই এক ইতিহাস তৈরি করল India national cricket team। ফাইনালে দুর্দান্ত দাপট দেখিয়ে তারা হারিয়ে দিল New Zealand national cricket team-কে এবং জিতে নিল তাদের তৃতীয় ICC Men’s T20 World Cup শিরোপা।
এই জয়ের পেছনে ছিল ভয়ংকর ব্যাটিং, ঝড়ো রান এবং পরে শক্ত বোলিং। ম্যাচের শুরুতে যেটা সাধারণ মনে হচ্ছিল, কয়েক ওভারের মধ্যেই সেটা পরিণত হয় এক ব্যাটিং তাণ্ডবে। আর সেই তাণ্ডবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিউজিল্যান্ডের বোলারদের যেন কোনো উত্তরই ছিল না।
ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় আহমেদাবাদের বিখ্যাত Narendra Modi Stadium-এ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত এই মাঠে হাজার হাজার দর্শকের সামনে শুরু হয় শিরোপা লড়াই।
নিউজিল্যান্ড টস জিতে প্রথমে ভারতকে ব্যাট করতে পাঠায়। শুরুতে মনে হয়েছিল সিদ্ধান্তটি হয়তো ভালোই ছিল। কারণ প্রথম দুই ওভারে ভারতের রান ওঠে মাত্র ১২। পিচ দেখে তখন অনেকেই ভাবছিলেন, এখানে ১৭০–১৮০ রান করাও কঠিন হবে।
কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই—কিছু মুহূর্তেই সব হিসাব উল্টে যেতে পারে।
প্রথম দুই ওভারের পর যেন হঠাৎ ঝড় বয়ে গেল মাঠে। ব্যাট হাতে ঝলসে উঠলেন Abhishek Sharma এবং Sanju Samson।
দুজন মিলে এমন আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শুরু করলেন যে নিউজিল্যান্ডের বোলাররা দিশেহারা হয়ে পড়েন। চার-ছক্কার বৃষ্টি শুরু হয় স্টেডিয়ামে। দর্শকের গর্জনে তখন পুরো মাঠ কাঁপছে।
মাত্র ছয় ওভারে ভারতের স্কোর পৌঁছে যায় ৯২ রানে। টি২০ ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে এমন শুরু সত্যিই বিরল।
ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা তখনই বুঝতে শুরু করেন—আজ বড় কিছু হতে যাচ্ছে।
একটা সময় মনে হচ্ছিল ১৭০ রানই বড় স্কোর হবে। কিন্তু মাত্র চার ওভারের মধ্যে ম্যাচের চিত্র পুরো বদলে যায়।
অভিষেক শর্মা দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। মাত্র ২১ বলে তিনি করেন ঝড়ো ৫২ রান। তার ইনিংসে ছিল একের পর এক বাউন্ডারি আর বিশাল ছক্কা। এই ইনিংস ভারতের স্কোরবোর্ডকে দ্রুত এগিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত Rachin Ravindra-র বলে আউট হয়ে ফেরেন অভিষেক। তবে তার কাজ তখন অনেকটাই হয়ে গেছে।
অভিষেক ফিরে গেলেও ভারতের রান থেমে থাকেনি। বরং আরও দ্রুত এগোতে থাকে।
সঞ্জু স্যামসনের সঙ্গে যোগ দেন Ishan Kishan। দুজন মিলে আবার শুরু করেন বাউন্ডারির উৎসব।
নিউজিল্যান্ড তখন ফিল্ডিং ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু তাতেও খুব একটা লাভ হয়নি। বল মাঠের এদিক-ওদিক উড়তে থাকে।
মাত্র ১৫ ওভারেই ভারত পার করে ফেলে ২০০ রানের গণ্ডি, তাও মাত্র এক উইকেট হারিয়ে। টি২০ ম্যাচে ২০ ওভারে যে স্কোরকে বিশাল ধরা হয়, সেটাই তখন ১৫ ওভারেই উঠে গেছে।
একটা মজার রেকর্ডও হয় এই ম্যাচে। ১৪ ওভারের মধ্যেই ভারত মেরে ফেলে ১৪টি চার এবং ১৪টি ছক্কা।
ক্রিকেটে নাটক না থাকলে যেন গল্প সম্পূর্ণ হয় না। ঠিক তেমনটাই ঘটল ১৬তম ওভারে।
বল হাতে এলেন James Neesham। আর এই ওভারেই হঠাৎ ম্যাচে ফিরে আসে নিউজিল্যান্ড।
প্রথমে আউট হন সঞ্জু স্যামসন। তিনি ৪৬ বলে খেলেন দারুণ ৮৯ রানের ইনিংস। এরপর ফিরে যান ঈশান কিষাণ, তার ব্যাট থেকে আসে ২৫ বলে ৫৪ রান।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল অধিনায়ক Suryakumar Yadav-এর উইকেট। তিনি শূন্য রানে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান।
এক ওভারে তিন উইকেট পড়ে যাওয়ায় পুরো স্টেডিয়াম মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়।
এই তিন উইকেটের পর নিউজিল্যান্ড কিছুটা হলেও ম্যাচে ফিরে আসে। ভারতের রান করার গতি একটু কমে যায়।
এর মধ্যে আউট হন Hardik Pandya-ও। ফলে শেষ কয়েক ওভারে ভারত খুব বেশি রান তুলতে পারেনি।
১৬ থেকে ১৯ ওভার পর্যন্ত এই চার ওভারে ভারত করে মাত্র ২৮ রান। এই সময় একটিমাত্র চার ও একটি ছক্কা আসে।
তখন প্রশ্ন উঠেছিল—ভারত কি ২৫০ পার করতে পারবে?
শেষ ওভারে আবার নাটক। বল হাতে তখনও ছিলেন নিশাম।
কিন্তু এবার তাকে থামালেন Shivam Dube।
শেষ ওভারে দুবে একেবারে ঝড় তুললেন। তিনি পরপর ছক্কা ও চার মেরে ম্যাচের শেষ মুহূর্তকে করে তুললেন রোমাঞ্চকর।
শেষ ওভারে ভারত তোলে ২৪ রান। আর তাতেই তাদের স্কোর পৌঁছে যায় দুর্ভেদ্য ২৫৫ রানে।
২৫৫ রান টি২০ ফাইনালে সত্যিই বিশাল স্কোর। পরে বল হাতে ভারতের বোলাররাও দারুণ পারফরম্যান্স দেখান।
নিউজিল্যান্ড শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায়। নিয়মিত উইকেট হারাতে থাকায় তারা ম্যাচে আর ফিরতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানে জিতে তৃতীয়বারের মতো টি২০ বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে নেয় ভারত।
এই জয় শুধু একটি ট্রফি জেতা নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে আধুনিক টি২০ ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় মনে হচ্ছিল ম্যাচটি হবে সমান লড়াইয়ের। কিন্তু ভারতের ব্যাটিং শক্তি পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়।
অভিষেকের ঝড়, সঞ্জুর পরিণত ইনিংস, ঈশানের দ্রুত রান এবং শেষ দিকে দুবের বিস্ফোরণ—সব মিলিয়ে এক দুর্দান্ত দলীয় পারফরম্যান্স দেখা গেছে।
ক্রিকেটপ্রেমীরা অনেক দিন এই ম্যাচের কথা মনে রাখবেন।
কারণ এমন ব্যাটিং ঝড় আর ফাইনালে এমন আধিপত্য খুব বেশি দেখা যায় না।



