ক্রিকেটকে ভদ্রলোকের খেলা বলা হয়। কিন্তু মাঝেমধ্যে কিছু ঘটনা সেই সম্মানকে বড় ধাক্কা দেয়। আবারও তেমনই একটি বিতর্ক সামনে এসেছে। ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সাবেক খেলোয়াড় জেভন সিয়ার্লেসকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা আইসিসি।
এই ঘটনা সামনে আসতেই আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ক্রিকেটের পুরনো ফিক্সিং কেলেঙ্কারি। ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে করতেই পারেন আইপিএলের সেই কুখ্যাত ম্যাচ ফিক্সিং কাণ্ড, যেখানে শ্রীসন্থসহ কয়েকজন তারকা ক্রিকেটার শাস্তির মুখে পড়েছিলেন। সেই ঘটনার পর কঠোর নজরদারি চালু হলেও বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া লিগে মাঝে মাঝে গড়াপেটার অভিযোগ ওঠেই। এবার সেই তালিকায় নতুন করে যুক্ত হলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটি ঘরোয়া প্রতিযোগিতা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজে অনুষ্ঠিত হওয়া ঘরোয়া টি-১০ টুর্নামেন্ট ‘বিম-১০’ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই সন্দেহের নজর ছিল। অভিযোগ উঠেছে, ২০২৩–২৪ মৌসুমে এই প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের অনিয়ম ও ম্যাচ গড়াপেটা হয়েছে।
এই তদন্তের পর আইসিসি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম হলো জেভন সিয়ার্লেস। অভিযোগ রয়েছে, তিনি শুধু ম্যাচ গড়াপেটায় যুক্ত ছিলেন না, বরং অন্যদেরও এতে সহায়তা করেছেন এবং ম্যাচের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।
জেভন সিয়ার্লেস ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের পরিচিত নাম। ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই অলরাউন্ডার দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলেছেন। আইপিএলেও তিনি কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন।
২০১৮ সালের আইপিএল মৌসুমে কেকেআরের হয়ে চারটি ম্যাচ খেলেছিলেন সিয়ার্লেস। যদিও খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি, তবুও সেই সময় তিনি দলের অংশ ছিলেন এবং আইপিএলের মতো বড় মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন।
এছাড়া ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স দলের হয়ে প্রায় পাঁচ বছর খেলেছেন তিনি। তাই ক্রিকেটভক্তদের কাছে তার নাম নতুন নয়। কিন্তু এবার তার বিরুদ্ধে ওঠা গড়াপেটার অভিযোগ ক্যারিয়ারের ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
এই বিতর্ক শুধু একজন খেলোয়াড়কে ঘিরে নয়। তদন্তে আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে।
বিম-১০ টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া টাইটান্স ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক চিত্তরঞ্জন রাঠোর এবং দলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ট্রেভন গ্রিফিথের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারাও ম্যাচ গড়াপেটার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ফলাফল প্রভাবিত করার পরিকল্পনায় ভূমিকা রেখেছেন।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ তিনজনকেই সব ধরনের ক্রিকেট কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
তবে এই নিষেধাজ্ঞা এখনও চূড়ান্ত নয়। ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ তিনজনকেই নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ দিয়েছে।
তাদের জানানো হয়েছে, আগামী ১৪ দিনের মধ্যে তারা যদি নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাব দিতে পারেন এবং প্রমাণ করতে পারেন যে তারা নির্দোষ, তাহলে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হতে পারে।
কিন্তু যদি তারা তা করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাদের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন শাস্তি। সেক্ষেত্রে আজীবনের জন্য ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ক্রিকেট মহলে অনেকেই বলছেন, এই টুর্নামেন্ট নিয়ে সন্দেহ নতুন নয়। বিম-১০ প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর থেকেই এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিট অনেক দিন ধরেই এই প্রতিযোগিতার ওপর নজর রাখছিল। কারণ এর আগেও কয়েকটি ম্যাচে অস্বাভাবিক ফলাফল এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
এই কারণেই তদন্ত শুরু করা হয় এবং ধীরে ধীরে একাধিক ব্যক্তির নাম সামনে আসে।
এই একই টুর্নামেন্টকে ঘিরে এর আগেও এক ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাটার অ্যারন জোন্সকে ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে আসে, তিনি টুর্নামেন্টের কয়েকটি ম্যাচে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। এরপর তাকে শাস্তি দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে আরও বড় কেলেঙ্কারি সামনে আসতে পারে। আর এবার সেই আশঙ্কাই যেন সত্যি হলো।
ক্রিকেটে গড়াপেটার ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটে এমন ঘটনা সামনে এসেছে।
বিশেষ করে ছোট বা ঘরোয়া লিগগুলোতে এই ধরনের অনিয়মের ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ সেখানে নজরদারি তুলনামূলক কম এবং অনেক সময় খেলোয়াড়রা আর্থিক লোভে ভুল পথে পা বাড়ান।
আইসিসি ও অন্যান্য ক্রিকেট বোর্ড অবশ্য এই সমস্যা মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। নিয়মিত নজরদারি, তদন্ত এবং কঠোর শাস্তির মাধ্যমে তারা এই দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা করছে।
৩৯ বছর বয়সী জেভন সিয়ার্লেসের জন্য এই অভিযোগ বড় ধাক্কা। ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে এসে এমন বিতর্ক তার ক্রিকেট জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
যদি তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে শুধু তার ক্যারিয়ারই নয়, ক্রিকেটে তার দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনামও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
একজন ক্রিকেটারের জন্য এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কিছু হতে পারে না। কারণ ক্রিকেট শুধু পেশা নয়, অনেকের কাছে এটি সম্মান ও গর্বের বিষয়।
এই ঘটনাগুলো ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই আইসিসি এবং বিভিন্ন ক্রিকেট বোর্ড এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।
প্রতিটি ম্যাচে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলেই দ্রুত তদন্ত শুরু করা হচ্ছে।
ক্রিকেটপ্রেমীরা আশা করেন, এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কমে আসবে এবং ক্রিকেট আবারও পুরোপুরি পরিষ্কার ও বিশ্বাসযোগ্য খেলা হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।
ক্রিকেট দুনিয়ায় এখন সবার নজর এই ঘটনার দিকে। জেভন সিয়ার্লেস এবং অন্য অভিযুক্তরা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়। আগামী কয়েকদিনেই স্পষ্ট হয়ে যাবে এই বিতর্কের শেষ পরিণতি।



