মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি বর্তমানে এক অস্থির সময় পার করছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিমান হামলা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে ঘিরে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে—তিনি গুরুতর আহত, কোমায় আছেন, এমনকি মৃত্যুর দাবিও উঠেছে। অথচ এই অবস্থার মাঝেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার নামে একটি কঠোর বার্তা প্রচার করা হয়েছে, যেখানে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—যদি মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে না থাকেন, তাহলে বর্তমানে ইরান পরিচালনা করছে কে? এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরানের অবস্থান কী হতে পারে?
মোজতবা খামেনি ইরানের প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনির ছেলে। তার পিতার হত্যাকাণ্ডের পর তিনি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাকে ঘিরে রহস্য এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
৫৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষমতার আড়ালের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তিনি তার বাবার সময় থেকেই ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখতেন।
সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় তেহরানে খামেনি পরিবারের কম্পাউন্ড লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয়। সেই হামলাতেই মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে।
অপ্রমাণিত তথ্য অনুযায়ী—
- তার একটি বা দুটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে
- শরীরের অভ্যন্তরে গুরুতর আঘাত রয়েছে
- তিনি কোমায় থাকতে পারেন
তেহরানের সিনা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে তাকে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়েছে বলে গোপন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। হাসপাতালের একটি অংশ সম্পূর্ণভাবে নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।
তবে ইরানের সরকারিভাবে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতির মাঝেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার নামে একটি লিখিত বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়। সেখানে বলা হয়েছে—
- ইরান তার শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ নেবে
- যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে
- প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চায় ইরান
বিবৃতিতে বলা হয়, ইরান আশেপাশের দেশগুলোর শত্রু নয়, বরং তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোই মূল লক্ষ্য।
এছাড়াও তিনি দাবি করেন, ইরান তার মিত্রদের সহায়তায় প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।
ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—
- ইরাকের মিলিশিয়া বাহিনী ইরানকে সহায়তা করতে প্রস্তুত
- ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও আক্রমণে অংশ নিতে পারে
- লেবাননে হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রকেট হামলা চালাচ্ছে
এই শক্তিগুলোকে অনেক বিশ্লেষক “ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক” হিসেবে উল্লেখ করেন, যারা ইরানের ভূরাজনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক হামলায় তিনি তার বাবা, স্ত্রী এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়েছেন। তিনি বলেন, এই ক্ষতি সত্ত্বেও ধৈর্য এবং ঈশ্বরের উপর আস্থা তাদের শক্তি জোগাচ্ছে।
তার ভাষায়, প্রতিশোধের একটি অংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, তবে পুরো প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত এই বিষয়টি ইরানের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে।
মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমানে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব মূলত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর আঞ্চলিক কমান্ডারদের হাতে রয়েছে।
এই শক্তিশালী সামরিক সংগঠন ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমানে ইরানের শাসনব্যবস্থা এক ধরনের “ঘোস্ট লিডারশিপ”-এর মাধ্যমে চলছে। অর্থাৎ নেতা প্রকাশ্যে না থাকলেও তার নামে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে কারণ—
- মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে কোথাও দেখা দেননি
- কোনো ভাষণ দেননি
- এমনকি নিজের ক্ষমতা গ্রহণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না
ফলে অনেকেই সন্দেহ করছেন, তিনি হয়তো গুরুতর অসুস্থ বা অচেতন অবস্থায় আছেন।
ইরানের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, মোজতবা খামেনি ক্ষমতায় এসে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারেন।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ইরান এই কর্মসূচিকে শুধু সামরিক শক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের মতে, এটি ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখার কৌশলের অংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
- ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে
- যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দাম প্রায় ৩৮% বেড়েছে
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়।
বর্তমানে সংঘাত শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
- লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ প্রায় ২০০ রকেট ছুড়েছে
- ইসরায়েল পাল্টা হামলা চালিয়েছে
- উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে
এদিকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই সংঘাতের কারণে ইরানে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নেতৃত্ব সংকট এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
যদি মোজতবা খামেনি গুরুতর অসুস্থ থাকেন বা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে না পারেন, তাহলে ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে চলমান যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
মোজতবা খামেনিকে ঘিরে রহস্য এখনো কাটেনি। তিনি কি সত্যিই কোমায় আছেন, নাকি নিরাপত্তার কারণে গোপনে অবস্থান করছেন—এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে তার নামে প্রকাশিত প্রতিশোধের বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইরান যুদ্ধ থেকে পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে। বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে—ইরানের প্রকৃত নেতৃত্বের অবস্থা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে চলেছে।


