ভারতীয় দাবার ইতিহাসে নতুন সূর্যোদয় ঘটালেন দিব্যা দেশমুখ। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি এনে দিলেন এমন এক গৌরব, যা ভারত আগে কখনও দেখেনি—ফিডে মহিলা দাবা বিশ্বকাপের প্রথম ভারতীয় বিজয়ী। এই জয় কেবল একটি ট্রফি জেতা নয়, বরং এক নতুন যুগের সূচনা। ভারতের ঘরে প্রথমবারের মতো এল ফিডে-র মহিলা দাবা বিশ্বকাপের শিরোপা, এবং সেই ইতিহাস রচনা করলেন দিব্যা।
ফাইনালের লড়াই: হাম্পিকে হারিয়ে চূড়ায় দিব্যা
ভারতের এক নম্বর মহিলা দাবাড়ু কোনেরু হাম্পি, যিনি বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করে চলেছেন, তাঁকে হারিয়ে এই শিরোপা জিতেছেন দিব্যা। একেবারে ফাইনালে, টাইব্রেকারের র্যাপিড গেমে, অনেকে যেখানে হাম্পিকেই ফেভারিট বলে ধরে নিয়েছিলেন, সেখানেই নিজেকে প্রমাণ করলেন দিব্যা।
প্রথম দুইটি ক্লাসিক্যাল গেম ড্র হওয়ার পর, খেলা গড়ায় র্যাপিড টাইব্রেকারে। এবং এখানেই দিব্যা দক্ষতা, ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার অনন্য নিদর্শন রেখে জয় ছিনিয়ে নেন।
গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব ও বিশ্বকাপ জয়: দ্বিগুণ সাফল্য
এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে সঙ্গেই দিব্যা দেশমুখ অর্জন করলেন নিজের গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব। এতদিন পর্যন্ত তার নামের পাশে ছিল না গ্র্যান্ডমাস্টারের তকমা, কিন্তু এবার ফিডে বিশ্বকাপ জিতে সেই স্বপ্নপূরণের দ্বারও পেরিয়ে গেলেন।
শুধু তাই নয়, এই জয় তাঁকে সরাসরি ক্যান্ডিডেটস টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগও করে দিয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে এখন দিব্যার সামনে আরেকটি দরজা খুলে গেল।
১৫ নম্বর বাছাই থেকে বিশ্বসেরা: এক অনন্য অভিযাত্রা
এই ফিডে মহিলা দাবা বিশ্বকাপে দিব্যা ছিলেন ১৫ নম্বর বাছাই। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতার শুরুতেই তাঁকে বড় কোনো সম্ভাবনা হিসেবে ধরা হয়নি। তবে আত্মবিশ্বাস, ধারাবাহিকতা ও বিশ্লেষণক্ষমতা দিয়েই তিনি একে একে পরাজিত করেছেন নামীদামী খেলোয়াড়দের।
এই জয় শুধু ভারতের গর্ব নয়, বিশ্ব দাবা অঙ্গনে এক নতুন প্রতিভার আগমনের বার্তা। তাঁর খেলার স্ট্র্যাটেজি, ক্যালকুলেশন ও মানসিক দৃঢ়তা অনেকটাই বড় মঞ্চের দাবাড়ুদের মতোই পরিণত।
মহিলা দাবায় ভারতের নতুন ভোর
কোনেরু হাম্পি, হারিকা দ্রোনাভল্লি, তানিয়া সাচদেব—ভারতের মহিলা দাবার অনেক বড় বড় নাম রয়েছে, কিন্তু দিব্যার এই সাফল্য এক নতুন প্রজন্মের জাগরণের প্রতীক। তাঁর হাত ধরে আগামী দিনে আরো বহু তরুণী দাবায় আগ্রহী হবে, এমনটাই আশাবাদী গোটা দেশ।
আন্তর্জাতিক মানচিত্রে ভারতের অবস্থান আরও মজবুত
এই বিশ্বকাপ জয় শুধু দিব্যার ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, ভারতের দাবা উন্নয়ন কর্মসূচির সাফল্যও। ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম দাবা শক্তি হিসেবে উঠে আসছে। বিশ্বজুড়ে ভারতীয় দাবাড়ুরা যেমন দাপট দেখাচ্ছেন, মহিলা বিভাগেও সেই পিছিয়ে থাকার জায়গাটি পূর্ণ করলেন দিব্যা।
দিব্যা দেশমুখ কে? এক ঝলক তাঁর পেছনের গল্পে
- জন্ম: ২০০৫ সাল, নাগপুর, মহারাষ্ট্র
- শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: অল্প বয়স থেকেই দাবার প্রতি আগ্রহ; বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ
- অর্জন: জাতীয় চ্যাম্পিয়ন, এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ, এখন ফিডে মহিলা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ও গ্র্যান্ডমাস্টার
ভারতীয় দাবা ফেডারেশন ও ফিডের প্রশংসা
ফিডে সভাপতি ও ভারতীয় দাবা ফেডারেশন উভয়েই দিব্যার সাফল্যকে যুগান্তকারী বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা মনে করছেন, এই জয় শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বজুড়ে মেয়েদের দাবা খেলার প্রতি আগ্রহকে বাড়িয়ে দেবে।
সামনের লক্ষ্য: বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের আসন
এই মুহূর্তে দিব্যা কেবল একজন চ্যাম্পিয়নই নন, তিনি একজন প্রতিযোগী, যাঁর সামনে রয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবার সুবর্ণ সুযোগ। ক্যান্ডিডেটস টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে তিনি যদি সেখানে জয়ী হন, তবে বিশ্ব দাবার সিংহাসনেও বসার সুযোগ থাকবে তাঁর হাতে।
ভারতের গর্ব, বিশ্বের বিস্ময়
দিব্যা দেশমুখের এই জয় ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় হয়ে থাকবে। তিনি প্রমাণ করে দিলেন—প্রতিভা ও পরিশ্রম মিললে বয়স, র্যাঙ্কিং, অভিজ্ঞতা কোনো বাধা নয়।
ভারত পেয়েছে তার প্রথম মহিলা দাবা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। সেই সঙ্গে পেয়েছে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।


