বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে চলমান প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) দেশের ৩৯টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনার খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এই খসড়ার ওপর আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকছে আগামী ১০ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তে দেশের নানা অঞ্চলের ভোটারদের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে।
কোন কোন আসনের সীমানা পরিবর্তন হচ্ছে?
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ৩৯টি আসনের সীমানা নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নিচে পরিবর্তিত আসনগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:
পরিবর্তিত ৩৯টি সংসদীয় আসন: পঞ্চগড়: ১, ২, রংপুর: ৩, সিরাজগঞ্জ: ১, ২,সাতক্ষীরা: ৩, ৪,শরীয়তপুর: ২, ৩,ঢাকা: ২, ৩, ৭, ১০, ১৪, ১৯,গাজীপুর: ১, ২, ৩, ৫, ৬,নারায়ণগঞ্জ: ৩, ৪, ৫,সিলেট: ১, ৩,ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ২, ৩,কুমিল্লা: ১, ২, ১০, ১১,নোয়াখালী: ১, ২, ৪, ৫,চট্টগ্রাম: ৭, ৮,বাগেরহাট: ২, ৩
কেন এই সীমানা পরিবর্তন?
নির্বাচন কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সীমানা পরিবর্তনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। মূলত ভোটার সংখ্যা অনুযায়ী সীমানা ভারসাম্যপূর্ণ করা এর উদ্দেশ্য।
উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব:
- গাজীপুরে ভোটার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তাই সেখানে আরও একটি আসন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- বাগেরহাটে ভোটার সংখ্যা কম, তাই একটি আসন কমানোর সুপারিশ করেছে কারিগরি কমিটি।
সীমানা নির্ধারণে কোন নিয়ম মানা হয়েছে?
নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ১১৯ থেকে ১২৪ ধারা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে থাকে। কমিশনের অধীনে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়, যেটি:
- জনশুমারির তথ্য বিশ্লেষণ করে
- ভৌগোলিক অবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক অঞ্চল ইত্যাদি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়
- বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করে
- এবং কমিশনের সম্মতিক্রমে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করে
আপত্তি জানাতে সময়সীমা:
এই খসড়া সীমানার বিপক্ষে ১০ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত আপত্তি জানাতে পারবেন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, দল বা সংস্থা। এর পরই কমিশন আপত্তিগুলো খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সীমানা প্রকাশ করবে।
এই সীমানা পরিবর্তনে কী প্রভাব পড়বে?
- ভোটারের সংখ্যা অনুযায়ী আরও সুষম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যাবে
- নতুন এলাকা বা ইউনিয়ন নির্বাচনে সংযুক্ত হওয়া বা বাদ পড়ার ফলে ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী লড়াইয়ে পরিবর্তন আসবে
- রাজনৈতিক দলের প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনী কৌশলে পরিবর্তন ঘটতে পারে
- ভোটারদের জন্য নতুন কেন্দ্র বা আসন পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে
বিশেষ নজর দিতে হবে যেসব জেলার ওপর
| জেলা | গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন |
| গাজীপুর | ৬টি আসনের প্রতিটি সীমানা পরিবর্তিত; আসন সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব |
| ঢাকা | ৬টি আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারিত |
| বাগেরহাট | ২টি আসন, একটি বাদ পড়ার প্রস্তাব |
| নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী | একাধিক আসনে পরিবর্তন |
| সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া | প্রতিটিতে ২টি করে আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস |
আইনগত দিক ও কমিশনের দায়িত্ব
নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী আসনের সীমানা নির্ধারণে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করে থাকে। কমিশন এ বিষয়ে কোনও রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবের বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ টিম ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
কিভাবে আবেদন করবেন আপত্তির জন্য?
১. সংশ্লিষ্ট খসড়া সীমানা যদি আপনার এলাকার ওপর প্রভাব ফেলে এবং আপনি এতে আপত্তি জানাতে চান, তাহলে:
- লিখিতভাবে আবেদন করতে হবে নির্বাচন কমিশনে
- আবেদনপত্রে আপনার তথ্য, আপত্তির কারণ ও প্রমাণাদি সংযুক্ত করতে হবে
- ১০ আগস্ট ২০২৫-এর মধ্যে জমা দিতে হবে নির্বাচন ভবনে অথবা নির্ধারিত ই-মেইলে
সীমানা পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া নির্বাচনের ভারসাম্য ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নির্বাচনের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে এই সীমানা পরিবর্তন অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ। ভোটারদের তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে, সকল পক্ষের উচিত এই খসড়া সীমানা সম্পর্কে সচেতন থাকা ও প্রয়োজনে সময়মতো আপত্তি জানানো।


