সম্প্রতি কলকাতার লালবাজার গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণা কাণ্ড সামনে এসেছে। বাংলাদেশের নামী মডেল তথা অভিনেত্রী শান্তা পাল ভুয়ো পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কলকাতায় বিপুল সম্পত্তি কিনেছেন বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, অন্ধ্রপ্রদেশের এক যুবকের সঙ্গে অনলাইনে ‘ডিজিটাল বিয়ে’ করেছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি। যদিও ভারতীয় আইনে এখনও এমন কোনও বৈধ বিয়ের প্রক্রিয়া স্বীকৃত নয়।
বাংলাদেশ থেকে কলকাতা: শান্তার জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়
২০১৯ সাল পর্যন্ত শান্তা পাল বাংলাদেশের গ্ল্যামার দুনিয়ার পরিচিত মুখ ছিলেন। বিভিন্ন সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় জয়ী, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব, এবং অভিনয় জগতে প্রবেশ—সব মিলিয়ে এক উজ্জ্বল কেরিয়ার।
- ২০১৬ সালে ইন্দো-বাংলা বিউটি প্রেজেন্টে অংশগ্রহণ
- ২০১৯ সালে মিস এশিয়া গ্লোবাল প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি
- টলিউড, তামিল, ওড়িয়া ও তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের সুযোগ
- বাংলাদেশে “ব্যাচেলর ইন ট্রিপ” সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয়
তবে ২০২১ সালের মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা নিয়ে বিতর্কে জড়ান তিনি। শান্তার দাবি, প্রকৃত প্রতিযোগীদের বাদ দিয়ে এক প্রভাবশালী ব্যাংক কর্মকর্তার প্রেমিকাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। সেই সময় তিনি ঢাকার মহানগর আদালতে মামলা দায়ের করেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আত্মহত্যার হুমকিও দিয়েছিলেন।
লিভ-ইন সম্পর্ক ও ভুয়ো বিয়ে: অন্ধ্রের যুবকের সঙ্গে নতুন অধ্যায়
২০২৩ সালে শান্তা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে কলকাতায় আসেন এবং অন্ধ্রপ্রদেশের ভেঙ্গালাকাড এলাকার আশরফ নামে এক মার্চেন্ট নেভি কর্মীর সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকতেন।
- প্রথমে পার্ক স্ট্রিট, পরে গল্ফগ্রিন এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস
- আশরফের পাসপোর্ট নিজের হেফাজতে রেখে তার পরিচয়পত্রও ব্যবহার করেন
- ‘ডিজিটাল বিয়ে’-র দাবি করলেও কোনো প্রমাণ মেলেনি পুলিশের হাতে
এখানেই শেষ নয়, শান্তা ভুয়ো ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে বর্ধমানের বরশুল এলাকার গোপালপুরের বাসিন্দা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন।
জাল নথির কারচুপি: একের পর এক পরিচয়পত্র জালিয়াতি
শান্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, দালালচক্রের সাহায্যে তিনি নিচের ভুয়ো নথিগুলি তৈরি করিয়েছেন:
- দুটি আধার কার্ড – একটির ঠিকানা বর্ধমানে, অপরটি গল্ফগ্রিনে
- ভোটার কার্ড ও প্যান কার্ড
- রেশন কার্ড – মূলত নাগরিকত্ব প্রমাণে সহায়ক
এসব নথির সাহায্যে তিনি কলকাতায় ৬০ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের সম্পত্তি ক্রয় করেন। এই সমস্ত আর্থিক লেনদেনের তদন্ত করছে পুলিশ।
সিনেমায় শান্তার সুযোগ: গ্ল্যামার জগতেও চালিয়ে যাচ্ছিলেন কাজ
ভারত আসার পরও থেমে থাকেনি শান্তার ক্যারিয়ার। জানা গেছে—
- তামিল ভাষার একটি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান
- টলিউডে একটি বাংলা ছবিতে অভিনয় করলেও সেটি রিলিজ করেনি
- ওড়িয়া ও তেলুগু সিনেমায়ও কাজের কথা ছিল
- একাধিক বাংলা সিরিয়ালেও অভিনয়ের জন্য চেষ্টা করছিলেন
এই সুযোগগুলোর অনেকটাই নাকি আশরফের সংযোগে পাওয়া—এই দাবি তদন্তকারীদের।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ম্যানিপুলেশন: বাংলাদেশি পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা
পুলিশ জানিয়েছে, শান্তা এমনভাবে তার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল সাজিয়েছিলেন যেন তাকে ভারতীয় বলে মনে হয়।
- পাসপোর্ট, জন্মস্থান, পুরনো ছবি গোপন রাখা
- নতুন পরিচয় গড়ে তোলা—ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে ফেলা
এই প্রচেষ্টাই পুলিশের সন্দেহের জন্ম দেয় এবং লালবাজার গোয়েন্দারা তদন্তে নামেন। শেষমেশ শান্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিয়ের দাবি, কিন্তু প্রমাণ নেই: কী বলছে পুলিশ?
শান্তা দাবি করেছেন, তিনি ও আশরফ ‘ডিজিটাল মাধ্যমে বিয়ে’ করেছেন। কিন্তু পুলিশ এখনও পর্যন্ত এমন কোনও আইনানুগ বা প্রযুক্তিগত স্বীকৃত বিয়ের প্রমাণ খুঁজে পায়নি। ভারতের কোনও আইনেই এখনো “ডিজিটাল ম্যারেজ” স্বীকৃত নয়।
ভবিষ্যৎ কি শান্তার জন্য আরও অন্ধকার?
এই মামলার তদন্ত এখনও চলছে। পুলিশ এখন নিচের দিকগুলো খতিয়ে দেখছে:
- ভুয়ো পরিচয়পত্র তৈরির পেছনে কোন চক্র কাজ করেছে
- আশরফের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ
- শান্তার সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেনের উৎস
- অন্য কোথাও কি তিনি এই পরিচয়ে কোনও বেআইনি কাজ করেছেন?
এছাড়াও, শান্তার বিরুদ্ধে বিদেশি নাগরিক হিসেবে বেআইনিভাবে ভারতে অবস্থানের অভিযোগে ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী মামলা হতে পারে।


