আমরা ছোটবেলা থেকে শিখে আসি—ভালো করে পড়লে ভালো রেজাল্ট হবে, ভালো রেজাল্ট হলে ভালো জীবন হবে। কিন্তু সত্যি করে বলো তো, জীবন কি কখনও বইয়ের নিয়ম মেনে চলে? ক্লাসে আমরা সূত্র মুখস্থ করি, কিন্তু হঠাৎ প্রিয় মানুষ হারানোর কষ্টটা কীভাবে সামলাতে হয়, সেটা কে শেখায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কূটনীতিক ড. এরিক মোরশেদ লিখেছেন তাঁর নতুন বই ‘Life’s Hidden Syllabus’। এটি কোনো সাধারণ অনুপ্রেরণামূলক বই নয়। বরং জীবনের অদৃশ্য পাঠগুলোর গভীর বিশ্লেষণ।
জীবন কেন আলাদা এক ‘সিলেবাস’?
স্কুল-কলেজ আমাদের গ্রেড দেয়। কিন্তু জীবন? জীবন আগে পরীক্ষা নেয়, তারপর শেখায়। বইটির একটি লাইন পুরো ভাবনাটাকেই পরিষ্কার করে দেয়—স্কুল আপনাকে নম্বর দেয়, কিন্তু জীবন প্রথমে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
ধরো, তুমি অনেক ভালো ছাত্র। কিন্তু হঠাৎ চাকরি হারালে? কিংবা খুব কাছের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলে? তখন জিপিএ কোনো কাজে আসে না। তখন দরকার ধৈর্য, মানসিক শক্তি আর নিজেকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার সাহস।
এই বইয়ে লেখক দেখিয়েছেন, প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে জীবনের আসল শিক্ষা। আমরা যেগুলো এড়িয়ে যাই, সেগুলোই আসলে আমাদের বড় করে তোলে।
‘Life’s Hidden Syllabus’ বইয়ের মূল ভাবনা
এই বই কোনো নির্দেশিকা নয় যে “এভাবে চললেই জীবন সফল হবে।” বরং এটি এক ধরনের আমন্ত্রণ। নিজের ভেতরে ঢুকে নিজেকে নতুন করে চিনে নেওয়ার আমন্ত্রণ।
লেখক খুব সহজভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছেন—
শোক কীভাবে সামলাতে হয়
ভুলে না গিয়েও কীভাবে ক্ষমা করা যায়
ভেঙে পড়ার মুহূর্তে নিজেকে কীভাবে ধরে রাখা যায়
অন্ধকার সময়েও কীভাবে আশার আলো খুঁজে পাওয়া যায়
ভাবো তো, আমরা কত কিছু শিখি—গণিত, বিজ্ঞান, ব্যবসা। কিন্তু “ক্ষমা” করার মতো বিষয়টা কি কোথাও সিলেবাসে ছিল? অথচ সম্পর্ক বাঁচাতে এটা সবচেয়ে বেশি দরকার।
ড. এরিক মোরশেদের অভিজ্ঞতার গভীরতা
ড. এরিক মোরশেদ শুধু একজন লেখক নন। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক এবং ব্যবসায়ী। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশে Lao PDR Honorary Consulate in Bangladesh–এর অনারারি কনসাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ডক্টরেট করা এই মানুষটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নেতৃত্ব উন্নয়ন এবং নীতি-পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। এত বৈচিত্র্যময় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই এসেছে বইটির গভীরতা।
একজন মানুষ যখন শিক্ষা, কূটনীতি আর ব্যবসা—এই তিন জগৎ কাছ থেকে দেখেন, তখন তাঁর জীবনের উপলব্ধিও হয় আলাদা। সেই উপলব্ধির ছাপ বইয়ের প্রতিটি পাতায় পাওয়া যায়।
জীবনবোধ ও আত্ম-অনুসন্ধান: বইটির বিশেষ শক্তি
এই বই পড়তে বসলে মনে হবে কেউ খুব শান্তভাবে তোমার সঙ্গে কথা বলছে। উপদেশ দিচ্ছে না, কিন্তু ভাবতে বাধ্য করছে।
ধরো, তুমি জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছ। বাইরে থেকে হাসছ, কিন্তু ভেতরে ক্লান্ত। এই বই সেই মানুষদের জন্য। যারা চুপচাপ লড়ে যায়, কাউকে কিছু না বলে নিজের ভেতরে ঝড় সামলায়।
বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ঠিক এমন মানুষদের—যারা বুকের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে হাসিমুখে দিন কাটায়। যারা অন্ধকারেও আলো খোঁজে।
প্রকাশনা ও সংগ্রহের তথ্য
বইয়ের নাম: Life’s Hidden Syllabus
লেখক: ড. এরিক মোরশেদ
প্রকাশনী: কলি প্রকাশনী
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মূল্য: ৫০০ টাকা / ১৫ মার্কিন ডলার
পরিবেশক: রকমারি ডট কম
দেশের পাঠকদের জন্য বইটি সহজেই সংগ্রহযোগ্য। অনলাইনে অর্ডার করলেও পাওয়া যাচ্ছে।
কেন এই বই ২০২৬ সালের সংগ্রহে রাখা উচিত?
এখনকার সময়টা খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। চারপাশে চাপ, প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা। আমরা সবাই ব্যস্ত সফল হতে। কিন্তু সুখী হতে? সেটা নিয়ে ভাবার সময় কই?
‘Life’s Hidden Syllabus’ আমাদের থামতে বলে। একটু ভেবে দেখতে বলে—আমরা আসলে কী শিখছি? আর কী শেখা বাকি রয়ে গেছে?
এই বই হয়তো তোমাকে এক রাতে বদলে দেবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে ভাবনার ভেতর একটা নরম পরিবর্তন আনবে। হয়তো তুমি নিজের কষ্টকে একটু অন্যভাবে দেখবে। হয়তো কাউকে ক্ষমা করা সহজ হবে। হয়তো নিজের ভুলগুলোকে এতটা ঘৃণা করবে না।
শেষ কথা
আমরা সবাই জীবনের ছাত্র। পার্থক্য শুধু এই—কারও সিলেবাস দেখা যায়, কারওটা লুকানো থাকে।
ড. এরিক মোরশেদের ‘Life’s Hidden Syllabus’ সেই লুকানো অধ্যায়গুলো সামনে আনে। যারা নিজের ভেতরের মানুষটাকে চিনতে চান, যারা প্রথাগত সাফল্যের বাইরে জীবনের গভীর মানে খুঁজতে চান—তাদের জন্য এই বই সত্যিই মূল্যবান।
এক কথায় বললে, এটি শুধু পড়ার বই নয়। এটি অনুভব করার বই। আর হয়তো, নিজের জীবনের নতুন পাঠ শুরু করারও একটি সুযোগ।



