যখন সন্ধের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ত শার্শার ধান্যখোলা আকাশে, তখন প্রকৃতির মোহময় এক গান বেজে উঠত। এই গান ছিলো কোদলা নদীর ভাটিয়ালি সুর — জীবনের, আশা-আকাংক্ষার, সংগ্রামের, আর বাঁচার যাত্রার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। নদীর বুক ভরে থাকত চঞ্চল জলরাশি, মাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠে স্পন্দিত হত জীবনের গভীর সুর। ছোট ছোট নৌকা দুলত ঢেউয়ের তালে, কেউ মাছ ধরত, কেউবা নদীর জলবন্দর থেকে পণ্যবাহী নৌকা টেনে নিয়ে যেত। এই নদী ছিলো শত হাজার মানুষের জীবনের অভিন্ন স্বপ্ন, জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু আজ, সেই কোদলা নদী শুধু স্মৃতিতেই বেঁচে আছে।
কোদলার বর্তমান অবস্থা: এক বিরাট বিপর্যয়ের সাক্ষী
যখন আমরা শার্শার দক্ষিণ ঘিবা সেতুর উপর দাঁড়িয়ে নদীর অবস্থা দেখি, চোখে পড়ে শুধুই শোকাবহ চিত্র। নদীর বক্ষ কচুরিপানার দাপটে ঢাকা, রঘুনাথপুরের চর জঙ্গলে পরিণত। ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে আটকে আছে নদীর প্রাকৃতিক জলগতি। বর্ষাকালে সামান্য জোয়ার আসে, তবে বছরের অধিকাংশ সময় নদী নিস্তব্ধ, নিঃসার ও নির্জীব।
শুকিয়ে যাওয়া নদী: জীবন থেকে বঞ্চিত ভূমি ও মানুষ
এক সময় কোদলা নদীর জল দিয়ে কৃষকরা সেচ করতেন, ফলে শস্য উৎপাদন হতো প্রচুর। ধান গজাতো, তাজা সবজি ফলত মাঠে-ঘাটে। কিন্তু আজ সেইসব খামার নিভে গেছে। নদী শুষ্ক হয়ে এক সরু নালায় পরিণত হয়েছে। নদীর খাতজুড়ে চরে গরু-ছাগল ঘুরে বেড়ায়, অথচ নদীর সজীবতা হারিয়ে গেছে। কোথাও নদী নামের অস্তিত্ব মুছে যেতে বসেছে।
নদী শুধু জল বয়ে আনত না; সে বয়ে আনত জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বপ্ন। আজ সেই জীবন থেমে গেছে। নদীর অবস্থা বুঝিয়ে দেয় গ্রামীণ জীবনের যে বিপর্যয় এসেছে।
কোদলার ঐতিহ্য: স্মৃতির ঝর্ণাধারা
কোদলা নদীর সঙ্গে বহু মানুষের জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা জড়িয়ে আছে। প্রথম জাল ফেলা, প্রথম সাঁতার শেখা, প্রথম প্রেমের স্বপ্ন—all rivers of memory flowing quietly in the depths of the heart. গ্রামের মানুষদের মনের একান্ত বন্ধু ছিল কোদলা।
ভাটিয়ালি গান: নদীর প্রাণবন্ত সুর
ভাটিয়ালি, যা ছিল কোদলা নদীর সবচেয়ে পরিচিত সাংস্কৃতিক নিদর্শন, মাঝিদের কণ্ঠে জীবন্ত হয়ে উঠত নদীর কাহিনী। নদী, মাছ, নৌকা, প্রেম ও সংগ্রামের গল্প বর্ণনা হতো এই গানে। এই সুর ছিল নদীর মুগ্ধতা, জীবনের গান, যা মানুষকে একত্রিত করত।
কিন্তু আজ সেই গান হারিয়ে যাচ্ছে ঝোপ-জঙ্গলের ভেতরে, নদীর নিঃশ্বাস ফুরিয়ে যাচ্ছে।
কোদলা নদীর পুনর্জীবনের সম্ভাবনা ও প্রস্তাবনা
আমরা বিশ্বাস করি যে, কোদলা নদী আবার ফিরে আসতে পারে জীবনের গতিপথে। প্রকৃতির পুনরুজ্জীবন সম্ভব, যদি মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকে।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও নদী পুনরুদ্ধার
কোদলা নদীর অবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা, নদীর চ্যানেল পুনঃস্থাপন, কচুরিপানার দূরীকরণ ও জলপ্রবাহ উন্নয়ন। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নদীর সুরক্ষা ও পুনর্জীবনের কাজ দ্রুত শুরু করতে হবে।
সেচ ও কৃষির আধুনিকায়ন
নদীর জল সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকদের জন্য পানীয় ও সেচ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা দরকার। স্মার্ট সেচ প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হলে নদীর জীবন ফিরে আসতে পারে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ
ভাটিয়ালি গান ও নদীর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপাদান সংরক্ষণ ও প্রসারে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নদীর ইতিহাস ও স্মৃতিকে জীবন্ত রেখে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করা সম্ভব।
গ্রামের মানুষের আকাঙ্ক্ষা: জীবন ফিরে পাবার স্বপ্ন
গ্রামবাংলার মানুষের মনে এখনও গভীরভাবে জাগ্রত আছে কোদলা নদীর পুনর্জীবনের আশাই। তারা প্রতিনিয়ত নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে, হয়তো সেই একদিন আসবে যখন নদী আবার জেগে উঠবে, জলচলনের ধ্বনি ফিরে আসবে, মাঝির গান আবার শোনা যাবে।
এই প্রত্যাশার মধ্য দিয়েই গ্রামীণ সমাজ জীবনের পুনরুজ্জীবন খুঁজে পায়।
সার্বিক চিন্তা: নদী ও মানুষের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
কোদলা নদী শুধু একটি জলপ্রবাহ নয়; এটি ছিল জীবনের ধারক ও বাহক। এর বুকে হাজারো মানুষের সংগ্রাম, হাসি, কান্না ও স্বপ্ন লুকিয়ে আছে। নদী হারালে হারায় জীবনের অর্থ, হারায় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
আজ আমাদের দায়িত্ব এই নদীর পুনর্জীবন নিশ্চিত করা, যেন আগামী প্রজন্ম এই নদীর ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে।


