যশোর শহরের ধর্মতলা মোড়—প্রাণবন্ত একটি সকাল, গাঢ় ধোঁয়ায় মেশা গরুর দুধের চায়ের ঘ্রাণে আচ্ছন্ন বাতাস, আর একটি টিনের দোকানে বসে থাকা দুইজন মানুষ। একজন আমি—একজন নিরপেক্ষ শ্রোতা, আর সামনে বসা মানুষটি পশ্চিমবঙ্গের কবি ও সাংবাদিক মৃদুল দাশগুপ্ত।
এই দৃশ্য কেবল এক কাপ চায়ের সঙ্গে গল্পের মুহূর্ত নয়, এটি একটি সাহিত্যিক আত্মীয়তার অদ্ভুত আবিষ্কার—যেখানে কথার রঙ, কবিতার সুর ও হৃদয়ের গভীরতা মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
মৃদুল দাশগুপ্ত: কবিতা ও করুণার সমন্বয়ে গড়া এক বিস্ময়
১৯৫৫ সালে হুগলির শ্রীরামপুরে জন্ম নেওয়া মৃদুল দাশগুপ্ত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “জলপাই কাঠের এসরাজ” দিয়ে বাংলা কবিতার জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। শব্দচয়নে ছিলেন ব্যতিক্রমী, এবং তার প্রতিটি কবিতা যেন জীবনের নিরব বাঁকগুলোকে ভাষা দেওয়ার এক প্রচেষ্টা।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
২০০০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘সূর্যাস্তে নির্মিত গৃহ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। তবে আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর সত্যিকারের পুরস্কার ছিল পাঠকের হৃদয়—যেখানে তিনি গভীর ছাপ রেখে গেছেন।
ভোমরা থেকে যাত্রা: বাংলাদেশের মাটিতে কবির পদচিহ্ন
দু’বছর আগের কথা। সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন মৃদুল দাশগুপ্ত। উদ্দেশ্য—সিরাজগঞ্জ ভ্রমণ, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি আজও জেগে আছে ধূলি ও বাতাসে। সেই সফরের এক সকালে, যশোর শহরের ধর্মতলায় আমাদের দেখা।
সেই সাক্ষাৎ ছিল যেন একটি কবিতার জন্মমুহূর্ত, যেখানে গরুর দুধের চায়ের গন্ধে মিশে ছিল তাঁর বলা শব্দের অনন্য গাম্ভীর্য ও প্রগাঢ় মানবিকতা।
চায়ের কাপে ছড়িয়ে থাকা কথা ও কাব্য: এক অনুপম সাহচর্য
চা খেতে খেতে কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি উচ্চারণ করেন তাঁর একটি কবিতার অনুচ্চারিত ধ্বনি—
“তুমি যেদিন দুঃখী হলে, আমি হেসে ফেলেছিলাম,
কারণ আমি জানতাম—তোমার চোখে একটা নদী তৈরি হচ্ছে।
সেই নদীর নাম ছিলো আমার।”
এই পঙক্তি শুধু শব্দের সুষমা নয়, এটি মানবমনের গভীরতার প্রতীক। তাঁর বলা প্রতিটি বাক্য যেন একটি অলক্ষ্য কবিতার অন্তঃস্বার।
ধর্মতলার চায়ের দোকান: যে জায়গা এক স্মৃতির রত্নভাণ্ডার
যশোর শহরের ধর্মতলা আজ আর শুধু এক জায়গা নয়, সেটি আমাদের কাছে একটি স্মৃতির পবিত্র স্থান। চায়ের কাপের প্রতিটি চুমুকে যেমন ভেসে উঠেছিল কথার অলংকার, তেমনি তাঁর সান্নিধ্যে মিলেছিল এক ধরণের অদৃশ্য শিক্ষালাভ—জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির।
তাঁর সৌম্য মুখভঙ্গি, নিঃশব্দ হাসি, ও কবিতার মতো করে বলা প্রতিটি বাক্য যেন আজও আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
ভাইয়ের বন্ধু নয়, আত্মার আত্মীয়
প্রথম পরিচয়টি ছিল আমার ভাইয়ের বন্ধুরূপে। কিন্তু চা-পানের কিছু মুহূর্তেই আমি অনুভব করলাম—এই মানুষটি যেন আমার আত্মার কোনো পুরোনো আত্মীয়, যাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে শুধু অনুভবে, ভাষায়, এবং সাহিত্যে।
তাঁর সঙ্গে কাটানো সেই সকালটি ছিল অসাধারণ মানবিক সংযোগের এক নিঃশব্দ অভিজ্ঞতা।
কবিতা যার জীবন, জীবন যার কবিতা
মৃদুল দাশগুপ্তের কাছে কবিতা ছিল কেবল সৃষ্টির মাধ্যম নয়, জীবনকে অনুধাবনের এক পদ্ধতি। তাঁর প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি শব্দচয়ন, এমনকি চায়ের কাপে তোলা তাঁর দৃষ্টি—সবকিছুতেই ছিল এক গভীর অর্থবোধকতা।
তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—একজন কবি কেবল ছন্দে নয়, মানবিকতায়ও শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
বাংলা কবিতায় এক অদ্বিতীয় স্বর
মৃদুল দাশগুপ্তকে বাংলা সাহিত্যে স্থান দেওয়া যায় কেবল কবি হিসেবে নয়, একজন সময়-সচেতন, সমাজ-নির্ভর, এবং হৃদয়বান শিল্পী হিসেবে। তাঁর কবিতাগুলো পড়লেই বোঝা যায়—এই মানুষটি সাধারণ শব্দকে অসাধারণ গভীরতায় নিয়ে যেতে পারতেন।
তাঁর লেখা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে উঠে আসে শব্দ, নীরবতা, নদী, দুঃখ, প্রেম—এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মানুষ।
স্মৃতির মেঘে ভেসে থাকা এক বিকেল: তাঁর প্রস্থানেও তাঁর উপস্থিতি
আজ তিনি হয়তো আমাদের মাঝখানে নেই, কিন্তু তাঁর কবিতা, মুখের সেই কোমল হাসি, আর চায়ের কাপে ভেসে থাকা মানবিকতার গল্পগুলো আজও বাতাসে ভেসে থাকে—একটি নরম বিকেলের মতো।
আমরা বিশ্বাস করি, এমন একজন মানুষ কখনো হারিয়ে যান না। তাঁর প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি স্মৃতি আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছে, কথা বলে।
উপসংহার: এক কাপ গরুর দুধের চা আর এক জীবনের পাঠ
সেদিনের সেই গরম গরুর দুধের চা যেমন আমাদের শরীরকে আরাম দিয়েছিল, তেমনি মৃদুল দাশগুপ্তের বলা প্রতিটি কথা আমাদের আত্মাকে উষ্ণতা দিয়েছিল। তাঁর উপস্থিতি আজ আর শারীরিক নয়, কিন্তু তাঁর কবিতা, তাঁর মানবিকতা আমাদের মাঝে চিরকাল জাগ্রত থাকবে।
আজ আমরা তাঁকে স্মরণ করছি একজন কবি-মানুষ হিসেবে, যিনি আমাদের পাশে থেকেও এক দিগন্তের ওপারে চলে গেছেন, রেখে গেছেন শুধু কবিতার এক স্নিগ্ধ পদচিহ্ন।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ৪ আগস্ট ২০২৫


